×

ঢাকা, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩

নবম-দশমের পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হচ্ছে জিয়াউর রহমানের লেখা নিবন্ধ

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৬ ১২:৩২:২৮

নবম-দশমের পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হচ্ছে জিয়াউর রহমানের লেখা নিবন্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ পাঠ্যবইয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ঐতিহাসিক একটি ডায়েরির ছবিও পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। নিবন্ধটি পাঠ্যভুক্ত করার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটি (এনসিসিসি)।

এনসিটিবি জানিয়েছে, নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ বইয়ে এটি নতুন অধ্যায় হিসেবে যুক্ত হবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম স্মৃতিকথা হিসেবে আলোচিত এই দলিলটি পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ বইয়ে জিয়াউর রহমানের ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধটি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এনসিসিসি এ বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। তার ভাষ্য, যার যতটুকু অবদান, তা নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে পাঠ্যবইয়ে তুলে ধরতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, নিবন্ধটি পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হলে শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম থেকে প্রচারিত ঐতিহাসিক ‘উই রিভোল্ট’ এবং কালুরঘাটের স্বাধীনতার ঘোষণার স্মৃতি সম্পর্কে জানতে পারবে। তাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস তুলে ধরার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, জিয়াউর রহমানের লেখা নিবন্ধটির ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনতার সংগ্রাম সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সুযোগ পাবে এবং পাঠ্যবইয়ে এটি অন্তর্ভুক্ত করা যৌক্তিক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ বলেন, নিবন্ধটি অন্তর্ভুক্তির ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা সম্পর্কে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য জানার সুযোগ পাবে। তার মতে, অতীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে যেভাবে একপাক্ষিক ইতিহাস চর্চা হয়েছে, বর্তমান সরকারের নির্মোহ ও নিরপেক্ষ ইতিহাস তুলে ধরার দৃষ্টিভঙ্গি সেই প্রবণতার অবসান ঘটাবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ আগস্ট মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সভায় নিবন্ধটি পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এনসিটিবির কারিকুলাম সংশ্লিষ্টরা জানান, নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ পাঠ্যপুস্তকের ২২ নম্বর গদ্যের লেখক পরিচিতি অংশে জিয়াউর রহমানকে মহান স্বাধীনতার ঘোষক, সাবেক রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান, জেড ফোর্সের অধিনায়ক, ১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার ও ‘বীর উত্তম’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধকে সর্বাত্মক ‘জনযুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ২৫ মার্চের গণহত্যার পর শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হলে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিকামী মানুষের জন্য ‘তুর্যধ্বনির মতো’ ছিল।

এনসিটিবি জানায়, প্রবন্ধের মূল বর্ণনার আগে একটি ব্যাখ্যামূলক অংশ রাখা হয়েছে। সেখানে ১৯৭২ সালে ‘দৈনিক বাংলা’য় প্রকাশিত ‘একটি জাতির জন্ম’ এবং ১৯৮০ সালে অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’কে মুক্তিযুদ্ধের অনন্য দলিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তি বা দলের কৃতিত্ব নয়।

এতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদকে ইতিহাসের অনিবার্য নাম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

কারিকুলাম সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, গদ্যটিতে ১৯৭১ সালের মার্চে চট্টগ্রাম থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সম্মুখসমরের আত্মত্যাগের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

প্রস্তাবিত প্রবন্ধে যা রয়েছে

মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র দায়িত্ব গ্রহণের প্রসঙ্গে জিয়াউর রহমান লিখেছেন, জাতির সংকটময় মুহূর্তে কাউকে না কাউকে সামনে এসে দায়িত্ব নিতে হয়। নেতারা অনুপস্থিত হয়ে যাওয়ার পর জাতির পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার দায়িত্ব তার ওপর এসে পড়ে। তিনি উল্লেখ করেন, ২৬ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে সেই সিদ্ধান্তের সময় আসে।

চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর তৎপরতা সম্পর্কে নিবন্ধে বলা হয়েছে, ১ মার্চ থেকে ২০তম বেলুচ রেজিমেন্টের রহস্যজনক গতিবিধি দেখে পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাচ্ছিল। ১৩ মার্চ নেতাদের সঙ্গে ইয়াহিয়ার গোলটেবিল বৈঠক শুরু হলেও পাকিস্তানি জেনারেলদের একের পর এক বিমানে আসা হামলার আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। ২৫-২৬ মার্চের রাতে চট্টগ্রাম বন্দরে জেনারেল আনসারীর কাছে রিপোর্ট করার নির্দেশও তিনি পান।

নিবন্ধের বর্ণনায় বলা হয়েছে, আগ্রাবাদের একটি ব্যারিকেডে ট্রাক থামার পর মেজর খালিকুজ্জামান তাকে জানান, পাকিস্তানি বাহিনী ক্যান্টনমেন্ট ও শহরে অভিযান শুরু করেছে এবং বহু নিরীহ মানুষ হতাহত হয়েছে। তখন জিয়াউর রহমান ‘উই রিভোল্ট’ বলে প্রতিরোধের নির্দেশ দেন এবং ষোলশহরে গিয়ে পাকিস্তানি অফিসারদের আটক ও ব্যাটালিয়নকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার নির্দেশ দেন।

এরপর ষোলশহরে গিয়ে ব্যাটালিয়নের অফিসার ও জওয়ানদের একত্র করে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কথা জানান। নিবন্ধ অনুযায়ী, সবাই এতে সাড়া দেয় এবং রাত ২টা ১৫ মিনিটে, ২৬ মার্চ ১৯৭১, সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়।

পটিয়ার পাহাড়ে প্রথম মুক্তাঞ্চল গঠন ও সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গে নিবন্ধে বলা হয়েছে, রাত ৪টায় রেললাইন ধরে পটিয়ার পাহাড়ের দিকে যাত্রার সময় ইপিআরের প্রায় ১০০ সদস্য তাদের সঙ্গে যোগ দেন। ২৬ মার্চের মধ্যেই তিনশ সদস্যের একটি বাহিনীকে চট্টগ্রামে পাঠানো হয় পাকিস্তানি বাহিনীর মোকাবিলায়। সেখানে তীব্র সম্মুখসমর হয় এবং পাকিস্তানি শিবিরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে।

কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার স্মৃতিও নিবন্ধে রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২৭ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় জিয়াউর রহমান রেডিও স্টেশনে যান। সেখানে একটি এক্সারসাইজ খাতার পৃষ্ঠায় স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম ঘোষণার বক্তব্য লিখেছিলেন। ওই ঘোষণায় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়।

নিবন্ধের বর্ণনা অনুযায়ী, বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে সেই ঘোষণা বিশ্বের বিভিন্ন রেডিওতে প্রচারিত হয় এবং বিশ্ববাসী প্রথম জানতে পারে, বাংলাদেশ স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে। ২৭ মার্চ সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে ইথারে ঘোষণাটি প্রচারের পর ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ নামটি বিশ্বমানচিত্রে উঠে আসে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।

এনসিসিসির সিদ্ধান্তের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেন, কমিটির সভায় নিবন্ধটি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন পেয়েছে। তার মতে, এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক ও নির্মোহ তথ্য জানার সুযোগ পাবে।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত