ঢাকা, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩

যে কারণে বন্ধ হয়ে যেতে পারে গ্যাস সরবরাহ

২০২৬ জুলাই ৩১ ১৫:২২:২০

যে কারণে বন্ধ হয়ে যেতে পারে গ্যাস সরবরাহ

নিজস্ব প্রতিবেদক: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)–এর মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থসংকটে পেট্রোবাংলার বিল পরিশোধে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় দেশের গ্যাস সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সময়মতো এলএনজির মূল্য পরিশোধ করা না গেলে বিদেশি সরবরাহকারীরা নতুন কার্গো পাঠাতে অনীহা দেখাতে পারে। এতে শিল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পেট্রোবাংলার অনুকূলে জরুরি ভিত্তিতে এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দের সুপারিশ করেছে অর্থ বিভাগ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চলতি জুলাই মাসের শেষ ১৫ দিনের ব্যয় মেটানোর জন্য এ অর্থ বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত নথিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, সময়মতো অর্থ পরিশোধ করা না গেলে বিদেশি এলএনজি সরবরাহকারীরা নতুন কার্গো পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বৃহস্পতিবার বিকেলে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে গ্যাস সরবরাহে যাতে কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে, সে লক্ষ্যে এলএনজি আমদানির অর্থায়ন দ্রুত নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং বিকল্প সরবরাহ উৎস অনুসন্ধানের ওপরও জোর দেওয়া হয়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, চলমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে চায়। এ কারণেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর জরুরি বৈঠক হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে শুধু এলএনজি আমদানিতেই অতিরিক্ত ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। এতে বাজেট ঘাটতি আরও বাড়বে এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হবে।

তিনি আরও জানান, আগে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় তুলনামূলক কম দামে এলএনজি পাওয়া গেলেও বর্তমানে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এর ফলে মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে প্রায় এক হাজার ৮০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে মাসে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার মতো ভর্তুকি প্রয়োজন হতে পারে।

অর্থ বিভাগের বিশেষ সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুন থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত সরবরাহ করা এলএনজির বিপরীতে পেট্রোবাংলার প্রাক্কলিত ঘাটতি দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। যদিও চলতি অর্থবছরে এ খাতে আগে থেকেই দুই হাজার ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়েছিল এবং এর মধ্যে এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। নতুন পরিস্থিতিতে অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।

এর আগে মে ও জুন মাসে নির্ধারিত কার্গোর বাইরে অতিরিক্ত পাঁচটি এলএনজি কার্গো আমদানি করতে হয়েছে। ১ থেকে ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে আরও পাঁচটি কার্গো দেশে এসেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব কার্গোর বিল পরিশোধ করা না গেলে ভবিষ্যতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গ্যাসের মূল্য সমন্বয় করা হলেও প্রত্যাশিত রাজস্ব আয় হয়নি। বিক্রয় কাঠামোর পরিবর্তন এবং রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির কারণে জুলাইয়ের প্রথমার্ধেই প্রায় ১৯০ কোটি টাকা কম আয় হয়েছে। ফলে ওই সময়ের পাঁচটি এলএনজি কার্গোর বিপরীতে ঘাটতি বেড়ে প্রায় এক হাজার ৫৯৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

জ্বালানি বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আগে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় একটি এলএনজি কার্গো আমদানিতে প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয় হতো। বর্তমানে একই পরিমাণ এলএনজি স্পট মার্কেট থেকে কিনতে ৬৫০ থেকে ৯৫০ কোটি টাকা, কখনো তারও বেশি ব্যয় হচ্ছে। এ অবস্থায় সময়মতো বিল পরিশোধ করা না গেলে বিদেশি সরবরাহকারীরা নতুন কার্গো পাঠাতে অনাগ্রহী হতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানায় গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।

এ প্রসঙ্গে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন সম্প্রতি যুগান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে স্বল্পমেয়াদে সরকারকে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতেই হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে শুধু ভর্তুকির ওপর নির্ভর করলে সমস্যার সমাধান হবে না।

তিনি বলেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বড় বিনিয়োগ, গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার, দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বৃদ্ধি এবং শিল্পে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গ্যাসের অপচয় ও সিস্টেম লস কমিয়ে একটি টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমানোর সুপারিশ করে আসছে। সংস্থাটির মতে, ভর্তুকি কমিয়ে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ করলে বাজেটের ওপর চাপ কমবে এবং আর্থিক শৃঙ্খলা আরও শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি ঋণ প্রদানের শর্ত হিসেবেও আইএমএফ বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি ব্যয় কমানোর কথা বলে আসছে।

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

দেশের বাজারে ফের বেড়েছে সোনার দাম

দেশের বাজারে ফের বেড়েছে সোনার দাম

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বাজারে আবারও বেড়েছে সোনার গহনার দাম। স্থানীয় বাজারে তেজাবী (পিওর) সোনার মূল্য বৃদ্ধির কারণে ২২ ক্যারেট সোনার... বিস্তারিত