ঢাকা, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩

ভূমিকম্পে ঢাকার কোন এলাকাকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

২০২৬ জুন ২৪ ১৭:১৬:৫৬

ভূমিকম্পে ঢাকার কোন এলাকাকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভূমিকম্পের ঝুঁকির দিক থেকে ঢাকা শহরের কোন এলাকাকে তুলনামূলক নিরাপদ বলা যায়-এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কোনো এলাকার নিরাপত্তা মূলত নির্ভর করে ওই এলাকার ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং ভবনের কাঠামোগত মানের ওপর। যদিও শক্ত মধুপুরের লাল মাটির ওপর গড়ে ওঠা কিছু এলাকা তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, তবুও ভবনের নির্মাণমান এবং দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধারব্যবস্থাই শেষ পর্যন্ত ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো এলাকার ভূমিকম্প-ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, শহরের ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং দ্বিতীয়ত, অবকাঠামোগত পরিস্থিতি।

ভূতত্ত্ববিদ সৈয়দ হুমায়ুন আখতার এর আগে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার ভূতাত্ত্বিক গঠন প্রায় একই ধরনের। রাজধানীর অধিকাংশ অংশ, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল, মধুপুরের শক্ত লাল মাটির ওপর অবস্থিত।

তিনি জানান, মোঘল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ, পাকিস্তান এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বুড়িগঙ্গা নদীকেন্দ্রিক ও উত্তরমুখী নগরায়ণের ফলে এই লাল মাটির অঞ্চলগুলো দ্রুত দখল হয়ে যায়। পরবর্তীকালে শহর পূর্ব ও পশ্চিম দিকে সম্প্রসারিত হতে থাকে। এসব এলাকায় ছিল নরম পলিমাটি ও জলাশয়, যা পরে ভরাট করে বসতি ও স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।

সৈয়দ হুমায়ুন আখতারের মতে, শুধুমাত্র ভূতাত্ত্বিক গঠন বিবেচনায় নিলে মধুপুরের লাল মাটির ওপর গড়ে ওঠা রমনা, মগবাজার, নিউমার্কেট, লালমাটিয়া, খিলগাঁও, মতিঝিল, ধানমন্ডি, লালবাগ, মিরপুর, গুলশান ও তেজগাঁওসহ কয়েকটি এলাকা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ঢাকার বাসিন্দাদের নিরাপত্তা শুধু মাটির গঠনের ওপর নির্ভর করে না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারীর ভাষ্য, ঢাকার কোন এলাকা নিরাপদ আর কোনটি ঝুঁকিপূর্ণ-তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তিনি বলেন, “যতক্ষণ না ভবনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে, ততক্ষণ বলা যাবে না কোনটা ঝুঁকিপূর্ণ বা ঝুঁকিমুক্ত।”

তার মতে, আপাতদৃষ্টিতে পুরান ঢাকাকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও নতুন ও পুরান ঢাকার মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো রাস্তার প্রস্থ। পুরান ঢাকার সরু সড়কগুলো দুর্যোগের সময় মানুষ সরিয়ে নেওয়া এবং উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনাকে কঠিন করে তুলতে পারে।

একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, পুরান ঢাকার অনেক ভবন শত বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে এবং বিভিন্ন ভূমিকম্পেও ধসে পড়েনি। ফলে কোনো এলাকার নিরাপত্তা নির্ধারণে ভবনের কাঠামোগত মানই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকার জন্য ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’ বড় উদ্বেগ

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার ভেতরে সরাসরি কোনো ফল্ট লাইন বা চ্যুতি রেখা নেই। তবে বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ফল্ট জোন রয়েছে।

এর মধ্যে মিয়ানমার থেকে নোয়াখালী পর্যন্ত বিস্তৃত প্লেট বাউন্ডারি-১ এলাকায় ১৭৬২ সালে ৮ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। নরসিংদীর ওপর দিয়ে যাওয়া প্লেট বাউন্ডারি-২ এলাকায় অতীতে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে।

এ ছাড়া সিলেট হয়ে ভারতের দিকে বিস্তৃত প্লেট বাউন্ডারি-৩ এলাকায় ১৯১৮ ও ১৯৬৯ সালে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। ডাউকি ফল্টে ১৮৯৭ সালে ৮ দশমিক ১ মাত্রার এবং মধুপুর ফল্টে ১৮৮৫ সালে ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হয়।

গবেষকদের মতে, এসব ফল্টের কিছু অংশে ৩৫০ বছর, আবার কোথাও ৯০০ বছর পর বড় ধরনের ভূমিকম্প ঘটতে পারে।

তবে এর বাইরেও রয়েছে ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’, যা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বেশি। ব্লাইন্ড ফল্ট হলো এমন ধরনের চ্যুতি রেখা, যা ভূ-পৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছায় না। ফলে ভূ-পৃষ্ঠে কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন না থাকায় সাধারণ ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রে এগুলো শনাক্ত করা কঠিন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ফল্ট বিশেষভাবে বিপজ্জনক। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত দুটি ব্লাইন্ড ফল্ট শনাক্ত হয়েছে-একটি ময়মনসিংহে এবং অন্যটি রংপুরে। যেহেতু এসব ফল্ট সহজে শনাক্ত করা যায় না, তাই আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার সুযোগও সীমিত। এ কারণে ঢাকার জন্যও ব্লাইন্ড ফল্টগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

জাতীয় এর অন্যান্য সংবাদ