ঢাকা, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩

অবশেষে ‘৫০১’ নিয়ে মুখ খুললেন মামুনুল হক

২০২৬ জুন ২০ ১৪:২৯:৩৮

অবশেষে ‘৫০১’ নিয়ে মুখ খুললেন মামুনুল হক

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিএনপির সংসদ সদস্য খোন্দকার আবু আশফাক সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতা মাওলানা মামুনুল হকের রিসোর্টকাণ্ড ও ‘মুতা বিয়ে’ প্রসঙ্গ উত্থাপন করার পর পাঁচ বছর আগের ঘটনাটি আবারও আলোচনায় এসেছে। এরই প্রেক্ষাপটে শনিবার (২০ জুন) নিজের ফেসবুক পেজে দীর্ঘ একটি পোস্ট দিয়ে ঘটনার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেন মামুনুল হক। তার দাবি, ‘৫০১’ ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ব্যর্থ রাজনৈতিক প্রকল্প, যার মাধ্যমে তাকে জনসমক্ষে হেয় ও রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

পোস্টে মামুনুল হক উল্লেখ করেন, ২০২১ সালের ৩ এপ্রিল তিনি তার স্ত্রী জান্নাত আরাকে (ঝর্ণা) নিয়ে নারায়ণগঞ্জের রয়েল রিসোর্টের ৫০১ নম্বর কক্ষে অবস্থান করছিলেন। সে সময় পুলিশের নেতৃত্বে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মী, সাংবাদিক ও অন্যরা সেখানে উপস্থিত হন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রিসোর্টের রিসেপশন থেকে তাকে জানানো হয় যে পুরো রিসোর্ট পুলিশ ঘিরে ফেলেছে। পরে কক্ষের দরজা খোলার পর অনেকেই জোরপূর্বক ভেতরে প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন ডিভাইসের মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার শুরু করে।

তিনি দাবি করেন, ওই ঘটনায় তাকে এবং তার স্ত্রীকে বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি তার স্ত্রীকে ওয়াশরুমে রাখেন। পরে নারী পুলিশ সদস্য সেখানে প্রবেশ করেন এবং সেখান থেকেও লাইভ সম্প্রচার চালানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মামুনুল হক আরও বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি ও জান্নাত আরা নিজেদের বৈবাহিক সম্পর্কের বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানান এবং সেটি বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারও হয়। তার দাবি, প্রথমে পুলিশ তার মোবাইল ফোন জব্দ করলেও পরে এক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তথ্য যাচাইয়ের জন্য সেটি ফেরত দেন। পরিচিতজনদের সঙ্গে কথা বলার পর ওই কর্মকর্তা আশ্বস্ত হন। তবে পরবর্তীতে ডিজিএফআই কর্মকর্তারা এসে তাদের থানায় নেওয়ার নির্দেশ দেন বলে পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির দাবি করেন, রিসোর্টের বাইরে তখন হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল। তিনি তাদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টের লাইভ সুবিধা প্রযুক্তিগতভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

বিয়ে নিয়ে ব্যাখ্যা

ফেসবুক পোস্টে জান্নাত আরার সঙ্গে তার বৈবাহিক সম্পর্কের বিষয়েও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন মামুনুল হক। তিনি জানান, জান্নাত আরা আগে তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হাফেজ শহিদুল ইসলামের স্ত্রী ছিলেন এবং তাদের দুটি সন্তান রয়েছে। পরে পারস্পরিক সম্মতিতে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।

তার দাবি, বিচ্ছেদের পর জান্নাত আরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং একপর্যায়ে তিনি তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তবে তিনি আগেই জানিয়ে দেন যে ইসলাম অনুযায়ী একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সমতা রক্ষার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারবেন না। এরপর জান্নাত আরা সম্মতি দিলে শরিয়ত অনুযায়ী তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয় বলে দাবি করেন তিনি।

মামুনুল হক লিখেছেন, বিয়ের পর জান্নাত আরাকে একটি কুরআন শিক্ষাকেন্দ্রে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি সেলাই ও নারীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হন।

বিয়ে গোপন রাখার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, উপমহাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় একাধিক বিয়ে একটি সংবেদনশীল বিষয়। তাই প্রথম পরিবারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চাননি। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় আইনে প্রথম স্ত্রীর অনুমতির বিষয়টিও জটিলতা তৈরি করেছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি দাবি করেন, ইসলামে কাবিন বাধ্যতামূলক নয় এবং তার প্রথম বিয়েতেও কাবিন হয়নি। তবে তার একাধিক বিয়ের বিষয়টি ঘনিষ্ঠজনেরা জানতেন বলে পোস্টে উল্লেখ করেন।

অন্য নাম ব্যবহারের কারণ

রিসোর্টে অন্য নাম ব্যবহারের বিষয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন মামুনুল হক। তিনি জানান, তার পরিচয়পত্রে প্রথম স্ত্রী আমিনা তাইয়েবার নাম ছিল। অন্যদিকে জান্নাত আরার পরিচয়পত্রে তার সাবেক স্বামী শহিদুল ইসলামের নাম উল্লেখ ছিল। এ কারণে পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে প্রথম স্ত্রীর নাম ব্যবহার করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

প্রথম স্ত্রীকে ফোনে জান্নাত আরাকে শহিদুল ইসলামের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার প্রসঙ্গেও ব্যাখ্যা দেন তিনি। তার ভাষ্য, প্রথম স্ত্রী আগে থেকেই জান্নাত আরাকে ওই পরিচয়েই চিনতেন। পরিস্থিতি শান্ত রাখতে তিনি সেই পরিচয় ব্যবহার করেছিলেন।

আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার

পোস্টে মামুনুল হক প্রশ্ন তোলেন, তিনি বা জান্নাত আরা কোনো আইন ভঙ্গ করেছিলেন কি না। তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ তাদের কক্ষে প্রবেশ করে এবং পরে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যক্তিগত কল রেকর্ড ফাঁস করা হয়। এসব কর্মকাণ্ডের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

তার দাবি, তিনি রাষ্ট্রীয় আইন কিংবা শরিয়তের আইন কোনোটিই লঙ্ঘন করেননি। তবুও তাকে লক্ষ্য করে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ

মামুনুল হক দাবি করেন, রিসোর্ট ঘটনার পর তৎকালীন এনএসআই মহাপরিচালক তার সঙ্গে বৈঠক করেন এবং তাকে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন বলে পোস্টে উল্লেখ করেন।

এ ছাড়া জান্নাত আরা, তার বাবা, সাবেক স্বামী এবং পরিবারের সদস্যদের ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, জান্নাত আরাকে দীর্ঘ সময় হেফাজতে রাখা হয়েছিল।

আদালত ও সাক্ষ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জান্নাত আরার ছেলে আব্দুর রহমানকে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিতে উৎসাহিত করা হয়েছিল। তবে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তিনি প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরেন, ফলে সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায় বলে দাবি করেন মামুনুল হক।

‘মুতা বিয়ে’ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান

ফেসবুক পোস্টে তার বিরুদ্ধে প্রচারিত ‘চুক্তিভিত্তিক বিয়ে’, ‘সাময়িক বিয়ে’ বা ‘মুতা বিয়ে’র অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেন মামুনুল হক। তার ভাষ্য, জান্নাত আরার সঙ্গে তার বিয়ে ছিল শরিয়তসম্মত ইসলামি বিয়ে।

জান্নাত আরার বর্তমান অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি জানান, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল। তবে ২০২১ সালের ঘটনার পর বিভিন্ন মনোমালিন্যের কারণে আলোচনার মাধ্যমে ২০২৫ সালের মার্চে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে।

তার দাবি, বিচ্ছেদের আগ পর্যন্ত এবং নিজের কারাবাসকালেও জান্নাত আরার ভরণপোষণসহ প্রাপ্য সব অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার অভিযোগ

দীর্ঘ পোস্টে মামুনুল হক অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক ও আদর্শগত মতপার্থক্যের কারণে তার বিরুদ্ধে চরিত্রহননের চেষ্টা চালানো হয়েছে। আদালতেও তিনি হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন।

তার ভাষ্য, বিভিন্ন সময়ে তাকে দিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে কিংবা আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ানোর চেষ্টা করা হলেও তিনি তাতে রাজি হননি।

পোস্টের একটি বড় অংশে তিনি হজরত আয়েশা (রা.)-এর বিরুদ্ধে অপবাদ রটনার ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে নিজের সঙ্গে হজরত আয়েশা (রা.)-এর কোনো তুলনা করছেন না; বরং ওই ঘটনা থেকে অনুপ্রেরণা নিচ্ছেন।

মামুনুল হক আরও দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে পরিচালিত প্রচারণা ছিল তৎকালীন সরকারের বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ। এ প্রসঙ্গে তিনি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অতীতে পরিচালিত চরিত্রহননের প্রচারণার উদাহরণও তুলে ধরেন। পাশাপাশি রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে ইসলামপন্থি কিছু ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন।

পোস্টের একপর্যায়ে তিনি পবিত্র কোরআনের সূরা আল ইমরানের ৬১ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করে ‘মুবাহালা’র আহ্বান জানান। তার বক্তব্য, কেউ যদি তার বক্তব্যকে মিথ্যা মনে করেন, তাহলে এ ধরনের চ্যালেঞ্জে অংশ নিতে পারেন।

‘৫০১’কে বিজয়ের প্রতীক ঘোষণা

পোস্টের শেষাংশে ‘৫০১’ প্রসঙ্গে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন মামুনুল হক। তার ভাষায়, ‘৫০১’ কোনো নেতিবাচক প্রতীক নয়; বরং এটি ‘ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার দোসরদের পরাজয়ের দলিল’। তিনি বলেন, ‘৫০১’-কে তারা বিজয়ের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করছেন এবং ভবিষ্যতেও এটি উদযাপন করবেন। যেখানে এ প্রসঙ্গ উত্থাপিত হবে, সেখানে ‘৫০১’-এর বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

পোস্টের শেষে তিনি সবার জন্য আল্লাহর কাছে সুমতি কামনা করেন।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (২০ জুন)

আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (২০ জুন)

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের স্বর্ণবাজারে ক্রেতাদের জন্য স্বস্তির খবর এসেছে। টানা দুই দফা মূল্যবৃদ্ধি এবং এক দফা ভ্যাট সমন্বয়ের পর এবার... বিস্তারিত