ঢাকা, রবিবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২

একাত্তরের সাক্ষী সাংবাদিক মার্ক টালি আর নেই

২০২৬ জানুয়ারি ২৫ ২১:৪২:৩২

একাত্তরের সাক্ষী সাংবাদিক মার্ক টালি আর নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক: একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা ও পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নিষ্ঠুরতার চিত্র বিশ্বদরবারে তুলে ধরা ব্রিটিশ সাংবাদিক মার্ক টালি আর নেই। রোববার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি সাংবাদিক। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।

বিবিসির সাবেক জ্যেষ্ঠ এই সাংবাদিকের কণ্ঠস্বর কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছে ছিল অনন্য ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতীক। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কিংবা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড—সব ধরনের সংকটময় পরিস্থিতি গভীর দক্ষতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন করতেন তিনি।

১৯৩৫ সালে কলকাতায় জন্ম নেওয়া মার্ক টালির শৈশব কেটেছে ভারতীয় উপমহাদেশের পরিবেশে। তার বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী এবং মা পশ্চিমবঙ্গে জন্মগ্রহণকারী এক পরিবারের সন্তান, যাদের পূর্বপুরুষেরা দীর্ঘদিন ধরে ভারতে প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শৈশবে এক ব্রিটিশ আয়ার তত্ত্বাবধানে বড় হন টালি। সেই আয়া একবার তাকে গাড়িচালকের কাছ থেকে হিন্দিতে সংখ্যা শেখার কারণে তিরস্কার করে বলেছিলেন—‘এ ভাষা চাকরদের, তোমার নয়।’

কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই হিন্দি ভাষাই হয়ে ওঠে মার্ক টালির অন্যতম শক্তি। দিল্লিতে কর্মরত বিদেশি সাংবাদিকদের মধ্যে সাবলীল হিন্দি জানা ছিল বিরল, যা তাকে সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয় করে তোলে। ভারতজুড়ে তিনি পরিচিত ছিলেন স্নেহের নামেই—‘টালি সাহেব’।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ৯ বছর বয়সে পড়াশোনার জন্য যুক্তরাজ্যে যান তিনি। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন শেষে যাজক হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে থিওলজিক্যাল কলেজে ভর্তি হলেও পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।

১৯৬৫ সালে বিবিসির হয়ে ভারতে ফেরেন মার্ক টালি। প্রথমে প্রশাসনিক সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সাংবাদিকতায় যুক্ত হন এবং নিজস্ব উপস্থাপনাভঙ্গির জন্য আলাদা পরিচিতি গড়ে তোলেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের এপ্রিলে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করেন। ঢাকা থেকে সড়কপথে রাজশাহী সফর করেন টালি। পাকিস্তান সরকার সে সময় মাত্র দুইজন বিদেশি সাংবাদিককে সেখানে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল—অপরজন ছিলেন ব্রিটিশ টেলিগ্রাফের সাংবাদিক ক্লেয়ার হলিংওয়ার্থ।

বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টালি বলেছিলেন, পাকিস্তানি সেনারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে মনে করেই সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি দেয়। স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ পেয়ে তারা বুঝতে পারেন, কী ভয়াবহ গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। ঢাকা থেকে রাজশাহী যাওয়ার পথে তিনি দেখেছিলেন, গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে অনন্য অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে প্রদান করে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’।

এমজে/

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত