ঢাকা, শনিবার, ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ২৬ পৌষ ১৪৩২

বৈশ্বিক উত্তেজনার মাঝে চীন-রাশিয়া-ইরানের নৌ মহড়া

২০২৬ জানুয়ারি ১০ ১৭:৩৮:৩৮

বৈশ্বিক উত্তেজনার মাঝে চীন-রাশিয়া-ইরানের নৌ মহড়া

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়েছে। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপ এবং তেলবাহী ট্যাঙ্কার জব্দের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যখন কূটনৈতিক টানাপোড়েন তীব্র, ঠিক সেই সময় দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে যৌথ নৌ মহড়ায় নামল চীন, রাশিয়া ও ইরান। কেপটাউন সংলগ্ন জলসীমায় শুক্রবার চীনের নেতৃত্বে সপ্তাহব্যাপী এই সামরিক মহড়া শুরু হয়।

বার্তাসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানায়, উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকসের কাঠামোর অধীনে এ মহড়ার আয়োজন করা হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মহড়ায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার, জলদস্যুবিরোধী কৌশল এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সামরিক সমন্বয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

চীন, রাশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা দীর্ঘদিন ধরেই ব্রিকসের সদস্য রাষ্ট্র। অন্যদিকে ইরান ২০২৪ সালে এই জোটে যুক্ত হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—দেশটির ভেতরে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্ববিরোধী বিক্ষোভ চলমান থাকলেও সেই সময়েই ইরানের নৌবাহিনী এই আন্তর্জাতিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছে।

ব্রিকসের অন্য সদস্য দেশগুলো—ব্রাজিল, ভারত কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাত—এই মহড়ায় অংশ নিচ্ছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দক্ষিণ আফ্রিকার সশস্ত্র বাহিনীর এক মুখপাত্র জানান, আগামী শুক্রবার পর্যন্ত মহড়াটি চলবে, তবে অংশগ্রহণকারী সব দেশের তালিকা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

দক্ষিণ আফ্রিকার সাইমন্স টাউন এলাকায় ভারত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত দেশটির প্রধান নৌঘাঁটি। সেখানে চীন, রাশিয়া ও ইরানের যুদ্ধজাহাজের নিয়মিত যাতায়াত চোখে পড়ছে। চীনের পক্ষ থেকে ১৬১ মিটার দীর্ঘ ডেস্ট্রয়ার শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ ‘তাংশান’ অংশ নিয়েছে। রাশিয়ার বাল্টিক ফ্লিট পাঠিয়েছে তুলনামূলক ছোট যুদ্ধজাহাজ ‘স্তোইকি’ এবং একটি রসদ সরবরাহকারী ট্যাংকার।

মূলত গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে এই মহড়ার আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। তবে একই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় জি-২০ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ায় কূটনৈতিক বিবেচনায় মহড়ার সময়সূচি পিছিয়ে দেওয়া হয়।

এপি’র বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই নৌ মহড়া যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে। আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতি ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও দক্ষিণ আফ্রিকা সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটনের কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জারি করা এক নির্বাহী আদেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেন, দক্ষিণ আফ্রিকা ‘বিশ্বমঞ্চের অশুভ শক্তিগুলোর’ পাশে অবস্থান নিচ্ছে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন বন্ধের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একইসঙ্গে চীন ও রাশিয়াও নিয়মিতভাবে ব্রিকসের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা জোটের সমালোচনা করে আসছে।

দক্ষিণ আফ্রিকা বরাবরই দাবি করে আসছে, তারা জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে। তবে বাস্তবে রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে সামরিক ঘনিষ্ঠতা নিয়ে আগেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা গেছে। ২০২৩ সালে বাইডেন প্রশাসন অভিযোগ করেছিল, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা একটি রুশ জাহাজকে সাইমন্স টাউন নৌঘাঁটিতে ভিড়তে দেওয়া হয়েছিল এবং সেখান থেকে ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য অস্ত্র সরবরাহ করা হয়। যদিও দক্ষিণ আফ্রিকা সেই অভিযোগ নাকচ করে।

রুশ ও ইরানি যুদ্ধজাহাজকে স্বাগত জানানো নিয়ে দেশের ভেতরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার জোট সরকারের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স এই মহড়ার কড়া সমালোচনা করেছে। দলটির মতে, কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা রাশিয়া ও ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করে এ ধরনের সামরিক মহড়া আয়োজন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

এক বিবৃতিতে দলটি বলেছে, ব্রিকস সহযোগিতার আড়ালে এসব মহড়া আসলে কৌশলগত বার্তা দিচ্ছে। সরকারের অবস্থান বাস্তবে দক্ষিণ আফ্রিকাকে বিতর্কিত ও নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্কে জড়িয়ে ফেলছে।

এমজে/

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত