ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি ২০২৬, ২৪ পৌষ ১৪৩২

১৫ বছরেও ফেলানী হ'ত্যার বিচার নেই, কাঁদছেন বাবা-মা

২০২৬ জানুয়ারি ০৭ ১১:৫১:০৫

১৫ বছরেও ফেলানী হ'ত্যার বিচার নেই, কাঁদছেন বাবা-মা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও কাঁটাতারের সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য ভুলতে পারেন না নুর ইসলাম। সীমান্তে গুলিতে মেয়েকে হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াচ্ছেন প্রতিটি নিঃশ্বাসে। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত কিশোরী ফেলানী খাতুনের বাবা আক্ষেপ করে বলেন, এত বছরেও মেয়ের হত্যার বিচার না পাওয়া শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো দেশের জন্যই লজ্জার।

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে বাবার সঙ্গে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার সময় বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের গুলিতে নিহত হয় ফেলানী খাতুন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা তার মরদেহ কাঁটাতারে ঝুলে থাকার দৃশ্য দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছর পার হয়ে গেলেও আজও ন্যায়বিচারের মুখ দেখেনি ফেলানীর পরিবার। ভারতের উচ্চ আদালতে মামলা ঝুলে থাকায় ১৫ বছর ধরে আইনের দরজায় ঘুরছেন তার মা-বাবা। সময়ের সঙ্গে ক্ষত শুকায়নি, বরং প্রতীক্ষার যন্ত্রণা আরও তীব্র হয়েছে।

ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম বলেন, ‘আমার চোখের সামনে আমার মেয়েকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। যদি এই হত্যার বিচার হতো, তাহলে আর কোনো বিএসএফ সদস্য সীমান্তে গুলি চালানোর সাহস পেত না।’ তিনি বলেন, বয়স বাড়ছে, শক্তি ফুরিয়ে আসছে, কিন্তু একটাই চাওয়া মরে যাওয়ার আগে মেয়ের হত্যার বিচার দেখে যেতে চান।

ঘটনার পেছনের কষ্টকর বাস্তবতা তুলে ধরে নুর ইসলাম জানান, অভাবের তাড়নায় পরিবার নিয়ে ভারতে কাজ করতে গিয়েছিলেন তিনি। পরে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে দালালের সহায়তায় দেশে ফেরার সময় এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটে। তিনি বলেন, ‘গুলির পর মেয়ের লাশ কাঁটাতারে ঝুলে ছিল প্রায় পাঁচ ঘণ্টা। আমি প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসতে বাধ্য হই।’

ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন, ‘ফেলানী ছিল আমার বড় মেয়ে। ওকে হত্যার সময় আমি ভারতে ছিলাম। আমার বুকের ধনকে মেরে আমার জীবনটাই শূন্য করে দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ১৫ বছর ধরে আশায় আছেন একদিন না একদিন মেয়ের হত্যার সঠিক বিচার হবে।

জাহানারা বেগম বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ফেলানী হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে আর কোনো মায়ের কোল এভাবে খালি না হয়।

ফেলানী হত্যাকাণ্ডের পর ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে বিএসএফের বিশেষ আদালতে বিচার শুরু হয়। একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত অমিয় ঘোষকে খালাস দেওয়া হয়। পরে বিজিবির আপত্তিতে ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনরায় বিচার শুরু হলেও সেখানেও তিনি বেকসুর খালাস পান।

এরপর ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’-এর সহায়তায় ভারতের উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন নুর ইসলাম। একাধিকবার শুনানির দিন নির্ধারিত হলেও মামলাটি এখনো নিষ্পত্তির মুখ দেখেনি।

ফেলানীর ছোট ভাই আরফান হোসেন গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডে (বিজিবি) সদস্য হিসেবে যোগ দেন বোনের হত্যার স্মৃতি বুকে নিয়েই সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে নেমেছেন তিনি।

স্থানীয়রা বলছেন, ফেলানী হত্যার বিচার না হওয়ায় সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না। তাদের মতে, এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হলে সীমান্তে নিরস্ত্র মানুষের প্রাণহানি কমত।

১৯৯৬ সালে জন্ম নেওয়া ফেলানী খাতুন ছিলেন আট সন্তানের মধ্যে সবার বড়। পরিবারের সঙ্গে ভারতে বসবাস করলেও বিয়ের আশায় দেশে ফেরার পথেই কাঁটাতারের নিষ্ঠুর বাস্তবতায় থেমে যায় তার জীবন। আজও সেই মৃত্যু সীমান্ত হত্যার প্রতীক হয়ে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

চবি ‘ডি’ ইউনিটের ফল প্রকাশ

চবি ‘ডি’ ইউনিটের ফল প্রকাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ‘ডি’ ইউনিটের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।... বিস্তারিত