ঢাকা, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

আজ বিশ্ব বাঘ দিবস

২০২৬ জুলাই ২৯ ১০:৩৩:৪৪

আজ বিশ্ব বাঘ দিবস

ডুয়া ডেস্ক: বিশ্ব বাঘ দিবস উপলক্ষে বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার সংরক্ষণ কেবল একটি বিপন্ন প্রাণীকে রক্ষা করার বিষয় নয়; এটি পুরো ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় পরিবেশের নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সর্বশেষ শুমারিতে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়ে ১২৫টিতে পৌঁছালেও এখনো নানা ঝুঁকি কাটেনি।

বুধবার (২৯ জুলাই) পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস। এ উপলক্ষে বন বিভাগের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের সর্বশেষ শুমারি অনুযায়ী সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ১২৫টি। এর আগে ২০১৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১০৬ এবং ২০১৮ সালে ছিল ১১৪। ধারাবাহিক এ বৃদ্ধি সংরক্ষণ কার্যক্রমের ইতিবাচক ফল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বন বিভাগ জানায়, কঠোর আইন প্রয়োগ, স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের ফলে বাঘ হত্যা ও মানুষ-বাঘের সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে চোরা শিকার, বন্যপ্রাণী পাচার, জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন এবং আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার মতো হুমকি এখনো বিদ্যমান।

বাংলাদেশে বাঘ সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ শুরু হয় ১৯৭৩ সালে, যখন বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আদেশের মাধ্যমে সুন্দরবনে বাঘ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়। পরে ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে বাঘ শিকার, হত্যা, পাচার ও অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত হয়। এরপর প্রযুক্তিনির্ভর সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদার করে বন বিভাগ।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত আড়াই দশকে পূর্ব সুন্দরবনে অন্তত ৯১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চোরা শিকারি ও পাচারকারীদের হাতে ২৬টি, বনদস্যুদের হাতে ১৮টি, গ্রামবাসীর পিটুনিতে ১৪টি, বার্ধক্যে ২১টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে তিনটি বাঘ মারা যায়। একই সময়ে বাঘের আক্রমণে অন্তত ৪২৫ জন বনজীবী প্রাণ হারিয়েছেন। তবে ২০২৪ সালের পর থেকে সুন্দরবনে কোনো বাঘ হত্যা বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনী। বন বিভাগের সদস্যরা সেটিকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে প্রায় ছয় মাস চিকিৎসা দেন। পরে ১২ জুলাই সুস্থ হওয়ার পর বাঘিনীকে আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়। তার চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য বনাঞ্চলের আট কিলোমিটার এলাকায় ২০টি স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

বিশ্ব বাঘ দিবসের প্রাক্কালে পূর্ব সুন্দরবনে তিন দিনের ব্যবধানে দুইবার রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেখা মেলে। প্রথমে চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের বন অফিস এলাকায় এবং পরে শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্যের টাইগার পয়েন্টে একটি বাঘটিকে নদী সাঁতরাতে দেখা যায়।

গত ২৪ জুলাই আন্ধারমানিক বন অফিসের সামনে একটি বাঘিনী কিছুক্ষণ অবস্থান করে আবার জঙ্গলে ফিরে যায়। এরপর ২৬ জুলাই সকালে কচিখালী টাইগার পয়েন্ট এলাকায় টহলরত বন বিভাগের একটি নৌকার সামনে একটি বাঘ নদী পার হওয়ার সময় দেখা যায়। নৌকার শব্দ পেয়ে সেটি মাঝপথ থেকেই ফিরে যায়। বন বিভাগের স্মার্ট টিমের বোটচালক সাইফুর রহমান বিরল এই দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করেন।

পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, নদী ও খাল সাঁতরে চলাচল করা বাঘের স্বাভাবিক আচরণের অংশ। খাবারের সন্ধান, এলাকা পরিবর্তন কিংবা প্রাকৃতিক প্রয়োজনেই তারা এমনটি করে থাকে। তবে এত কাছ থেকে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সরকার সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, বন অপরাধ দমন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের কারণে মানুষ ও বাঘের সংঘাত কমেছে। তিনি জানান, আট কিলোমিটার এলাকাজুড়ে স্থাপিত ২০টি ক্যামেরা ট্র্যাপে সম্প্রতি নতুন তিনটি বাঘের ছবি ধরা পড়েছে। এছাড়া বর্তমানে সুন্দরবনে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় বন অনেকটাই মানব কোলাহলমুক্ত, ফলে বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী স্বাভাবিক পরিবেশে বিচরণ করছে।

পরিবেশ সংগঠন ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’-এর প্রধান সমন্বয়কারী ড. নূর আলম শেখ বলেন, সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় বন বিভাগ, স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ আরও শক্তিশালী করা জরুরি। তার ভাষায়, বাঘ বাঁচলে সুন্দরবন বাঁচবে, আর সুন্দরবন টিকে থাকলে উপকূলও নিরাপদ থাকবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘ বিশেষজ্ঞ ড. এম. এ. আজিজ বলেন, বাঘ সংরক্ষণে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণও জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে রক্ষা করা মানে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, এর জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখা। তাই চোরা শিকার ও পাচার বন্ধ, খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষা, বন ধ্বংস প্রতিরোধ এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেই বাঘ সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জন সম্ভব।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

আবারও বেড়েছে সোনার দাম

আবারও বেড়েছে সোনার দাম

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বাজারে সোনার দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভ্যাটসহ স্বর্ণালঙ্কারের দাম প্রতি... বিস্তারিত