ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩

কক্সবাজারে পাহাড়ধসে ১১ জনের মৃত্যু

২০২৬ জুলাই ০৭ ১৬:৫২:১৫

কক্সবাজারে পাহাড়ধসে ১১ জনের মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক: কক্সবাজারে টানা ভারি বর্ষণে এক রাতেই চারটি স্থানে পাহাড়ধসে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া জেলার পেকুয়া ও দরিয়ানগরে পৃথক ঘটনায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ জনে।

মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরে কক্সবাজার সদরের দরিয়ানগরে পাহাড়ধসে এক নারীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় শিশুসহ আরও চারজন আহত হন।

এর আগে রোববার রাত ১টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে উখিয়ার ৭, ১১ ও ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং কক্সবাজার শহরের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে প্রাণ হারান ৯ জন। নিহতদের মধ্যে উখিয়ার তিনটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মারা যান ৮ জন এবং কক্সবাজার শহরের বাসিন্দা একজন। অন্যদিকে, সোমবার দুপুরে পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নে পাহাড়ধসে এক শিশুর মৃত্যু হয়।

উখিয়ার ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একই পরিবারের তিনজন এবং ১১ নম্বর ক্যাম্পে একই পরিবারের চারজন নিহত হয়েছেন। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে রোহিঙ্গা শিবিরসহ পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৬ ব্লকে। রাত দেড়টার দিকে পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের বসতঘরের ওপর। মুহূর্তেই ঘরটি মাটিচাপা পড়ে যায়। খবর পেয়ে উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকেরা রাতভর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং তাদের চার বছরের ছেলে মোহাম্মদ আনাসের মরদেহ উদ্ধার করেন। দুর্ঘটনার সময় পরিবারের ১০ সদস্য ঘুমিয়ে ছিলেন। অলৌকিকভাবে সাতজন প্রাণে বেঁচে গেলেও তারা সবাই গুরুতর আহত হন।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই উদ্ধার অভিযান চালিয়ে তিনজনের মরদেহ এবং দুজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই রাত ২টার দিকে রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৭ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসে একরাম (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। সে ওই ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ রশিদের ছেলে।

এর প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রাত সাড়ে ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি-১১ ব্লকে পাহাড়ধসে একই পরিবারের চারজন নিহত হন। তারা হলেন— আব্দুর রাজ্জাকের দুই মেয়ে উম্মে হাবিবা (২৭) ও তানজিনা আক্তার (১৩) এবং মোহাম্মদ রশিদের দুই ছেলে মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে রাত ৩টার দিকে কক্সবাজার শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আলী আকবর নামে এক স্থানীয় বাসিন্দার মৃত্যু হয়।

এদিকে, কক্সবাজারের পেকুয়ায় গত দুই দিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ধসে সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের খলিফা মুরা আলিম্যার ঝিরি এলাকায় মো. মিনহাজ উদ্দিন (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। সে একই এলাকার কলিম উল্লাহর ছেলে। এ ঘটনায় পরিবার ও এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, ঘরচাপা পড়া অবস্থায় একই পরিবারের তিনজনকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। তবে আলী আকবরকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত পাহাড়ধসের ঘটনায় আটজন রোহিঙ্গাসহ মোট নয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহগুলো কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে সেগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

তিনি আরও বলেন, আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত পাহাড়ের পাদদেশ বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান না করার জন্য সবাইকে অনুরোধ করা হয়েছে। প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চললে অনেক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হবে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসকারী আবদুস সালাম ও মাহ আলম বলেন, বর্ষা মৌসুম এলেই তাদের জীবনে নেমে আসে আতঙ্ক। কখন পাহাড় ধসে ঘর চাপা পড়বে, সেই শঙ্কা নিয়েই দিন-রাত কাটাতে হয়। অধিকাংশ ঘরই পাহাড় কেটে তৈরি করা ঢালের ওপর বাঁশ, ত্রিপল ও অস্থায়ী উপকরণ দিয়ে নির্মিত। ভারি বৃষ্টি হলেই পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যায় এবং সামান্য ভূমিধসও মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু ধ্বংস করে দিতে পারে। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে স্বজন হারিয়েছে, আবার অনেকের ঘরবাড়ি ধসে গেছে।

শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্পই নয়, কক্সবাজার জেলা সদর, রামু ও উখিয়া উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ঘেরা এলাকায় প্রায় তিন লাখ মানুষ পাহাড়ের পাদদেশ ও ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছেন। টানা বৃষ্টিপাতে এসব এলাকাতেও ভূমিধসের আশঙ্কা বেড়ে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ক্যাম্পের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় ও কিছু রোহিঙ্গার অবৈধ পাহাড় কাটার কারণে বহু স্থানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বারবার সতর্ক করা হলেও একটি অসাধু চক্র পাহাড় কাটা অব্যাহত রেখেছে, যার পরিণতিতে আজকের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।

তিনি আরও বলেন, এটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়; বরং এক ধরনের মানবসৃষ্ট হত্যাকাণ্ড। যারা অবৈধভাবে পাহাড় কেটে এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

জাতীয় এর অন্যান্য সংবাদ

স্বর্ণের দাম কমেছে, ভরিতে কত?

স্বর্ণের দাম কমেছে, ভরিতে কত?

নিজস্ব প্রতিবেদক: টানা দুই দফা দাম বাড়ানোর পর দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। নতুন... বিস্তারিত