ঢাকা, রবিবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১১ মাঘ ১৪৩২

পাকিস্তানি বর্বরতা বিশ্বে তুলে ধরা মার্ক টালির বিদায়

২০২৬ জানুয়ারি ২৫ ২০:০৯:৩০

পাকিস্তানি বর্বরতা বিশ্বে তুলে ধরা মার্ক টালির বিদায়

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বর্বরতা বিশ্বদরবারে তুলে ধরে যিনি ইতিহাসের সাক্ষী হয়েছিলেন, সেই কিংবদন্তি ব্রিটিশ সাংবাদিক মার্ক টালি আর নেই। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের ইতি টেনে ৯০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।

রোববার (২৫ জানুয়ারি) ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিবিসির সাবেক এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর খবরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মার্ক টালির গভীর, গম্ভীর ও আবেগঘন কণ্ঠস্বর বিবিসি শ্রোতাদের কাছে ছিল অত্যন্ত পরিচিত। একজন সংবাদদাতা হিসেবে যেমন তিনি ছিলেন নির্ভীক ও বিশ্বস্ত, তেমনি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সমাজ ও মানবিক সংকট নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ছিল। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা কিংবা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড—সবকিছুই তিনি দক্ষতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন।

১৯৩৫ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন মার্ক টালি। তাঁর বাবা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। আর তাঁর মা পশ্চিমবঙ্গে জন্ম নেওয়া এক পরিবার থেকে এসেছিলেন, যাদের পূর্বপুরুষরা ভারতবর্ষে ব্যবসা ও প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শৈশবে এক ব্রিটিশ আয়ার তত্ত্বাবধানে বড় হন মার্ক টালি। সেই আয়া একসময় তাঁকে গাড়িচালকের কাছ থেকে হিন্দিতে সংখ্যা শেখায় বাধা দিয়ে বলেছিলেন, ‘ওটা চাকরদের ভাষা।’ অথচ পরবর্তীতে সেই হিন্দিই হয়ে ওঠে তাঁর বড় শক্তি।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হিন্দি ভাষায় অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন মার্ক টালি, যা দিল্লিতে কর্মরত বিদেশি সাংবাদিকদের মধ্যে ছিল বিরল ঘটনা। এই ভাষাজ্ঞানই তাঁকে ভারতীয়দের কাছে আপন করে তোলে, যারা স্নেহের সঙ্গে তাঁকে ডাকত ‘টালি সাহেব’ নামে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মাত্র ৯ বছর বয়সে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে ব্রিটেনে যান তিনি। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেন। একসময় যাজক হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে থিওলজিক্যাল কলেজে ভর্তি হলেও শেষ পর্যন্ত সেই পথ থেকে সরে আসেন।

১৯৬৫ সালে বিবিসির হয়ে ভারতে কাজ শুরু করেন মার্ক টালি। শুরুতে প্রশাসনিক সহকারী হিসেবে যুক্ত হলেও ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন প্রভাবশালী সাংবাদিক হিসেবে। তাঁর প্রতিবেদনের ধরন ছিল প্রচলিত ধারার বাইরে, স্বতন্ত্র ও গভীর পর্যবেক্ষণনির্ভর।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কাভার করতে ১৯৭১ সালের এপ্রিলে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। ঢাকা থেকে সড়কপথে রাজশাহী পর্যন্ত সফর করেন তিনি এবং চোখের সামনে দেখা ভয়াবহ দৃশ্য বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন।

সে সময় পাকিস্তান সরকার মাত্র দুজন বিদেশি সাংবাদিককে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিল। মার্ক টালির সঙ্গে ছিলেন ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য টেলিগ্রাফের যুদ্ধ সংবাদদাতা ক্লেয়ার হলিংওয়ার্থ।

পরবর্তীতে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্ক টালি বলেছিলেন, পাকিস্তানি সেনারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে মনে করেই আমাদের ঢোকার অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু আমরা স্বাধীনভাবে ঘুরে বাস্তব চিত্র দেখেছি। ঢাকা থেকে রাজশাহী যাওয়ার পথে গ্রামের পর গ্রাম পোড়ানো আর গণহত্যার চিহ্ন আমি নিজের চোখে দেখেছি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় সাহসী সাংবাদিকতা ও বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১২ সালে মার্ক টালিকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার।

এমজে/

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত