ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ৬ মাঘ ১৪৩২
রয়্যাল ডিগ্রির মরীচিকা ও বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার নীরব বিপর্যয়
দেশে আন্তর্জাতিক পোস্টগ্র্যাজুয়েট চিকিৎসা ডিগ্রি অর্জনের তীব্র প্রতিযোগিতা ও তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিকৃত কোচিং সংস্কৃতির কারণে এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা। ক্যারিয়ার ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠা এমআরসিপি (MRCP) ও এমআরসিএস (MRCS) ডিগ্রির নেশায় মেধার অপচয় ঘটিয়ে তরুণ চিকিৎসকরা রোগীসেবার পরিবর্তে আজীবন পরীক্ষার্থীতে পরিণত হচ্ছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে যেমন চিকিৎসকদের পেশাগত ও ক্লিনিক্যাল দক্ষতার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তেমনি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলো চিকিৎসক শূন্য হয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মৌলিক চিকিৎসাসেবা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। উন্নত ডিগ্রির এই মোহ কীভাবে নীরব এক সামাজিক ও স্বাস্থ্য বিপর্যয় ডেকে আনছে, তা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
রয়্যাল ডিগ্রির প্রভাব ও দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে বিশদ আলোকপাত করেছেন ডা. মাহিদুল ইসলাম জিহাদ। বিস্তারিত পড়ুন-
বাংলাদেশে MRCP ও MRCS আজ আর নিছক একটি আন্তর্জাতিক পোস্টগ্র্যাজুয়েট মেডিক্যাল পরীক্ষা নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি পরিণত হয়েছে একটি সামাজিক মানদণ্ড, ক্যারিয়ার-স্বপ্নের প্রতীক এবং অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসক পরিচয়ের শ্রেণিবিভাজক হিসেবে। সমস্যাটি এই পরীক্ষাগুলোর অস্তিত্বে নয়; বরং এই পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশে যে বিকৃত কোচিং সংস্কৃতি, অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা ও নৈতিক বিচ্যুতি গড়ে উঠেছে সেখানেই মূল সংকট। এই সংকট ব্যক্তিগত পর্যায়ে একজন তরুণ চিকিৎসকের জীবনকে যেমন প্রভাবিত করছে, তেমনি সামষ্টিকভাবে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঠেলে দিচ্ছে এক নীরব কিন্তু গভীর বিপর্যয়ের দিকে।
চিকিৎসক নয়, পরীক্ষার্থী তৈরি: মেধার কাঠামোগত অপচয়
একজন চিকিৎসকের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো তার কর্মজীবনের প্রথম কয়েকটি বছর। এই সময়েই তার গড়ে ওঠার কথা একজন দায়িত্বশীল ক্লিনিশিয়ান হিসেবে রোগী দেখা, সিদ্ধান্ত নেওয়া, সীমাবদ্ধতার মধ্যে চিকিৎসা দেওয়া, ভুল থেকে শেখা এবং নৈতিক বোধ তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই সময়ের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে- MCQ ও রিকলভিত্তিক প্রশ্ন মুখস্থে, কোচিং সেন্টারের নির্ধারিত নোটে পরীক্ষাভিত্তিক “স্টেশন-স্ক্রিপ্ট” অনুশীলনে, ফলে আমরা চিকিৎসক তৈরি করছি না; তৈরি করছি আজীবন পরীক্ষার্থী। এটি কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয় এটি একটি কাঠামোগত চাপের ফল। এখানে ব্রেইন ড্রেইনের চেয়েও ভয়াবহ একটি বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, যাকে বলা যায় brain misuse, মেধা আছে, কিন্তু তার সঠিক ব্যবহার নেই।
রোগীসেবা থেকে দীর্ঘমেয়াদি ও মানসিক বিচ্ছিন্নতা
MRCP/MRCS কেন্দ্রিক কোচিং সংস্কৃতি তরুণ চিকিৎসকদের ধীরে ধীরে রোগী থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। গ্রাম, উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে কাজ করাকে অনেকেই “ক্যারিয়ারের পথে বাধা” হিসেবে ভাবতে শুরু করছেন। ফলে কর্মস্থলে থেকেও তারা মানসিকভাবে অনুপস্থিত থাকেন মন পড়ে থাকে কোচিং সেন্টার ও পরবর্তী পরীক্ষার তারিখে। এই বিচ্ছিন্নতা কেবল পেশাগত নয়; এটি নৈতিক ও মানবিক বিচ্ছিন্নতা। একজন চিকিৎসক যখন রোগীকে নিজের ভবিষ্যতের অংশ হিসেবে ভাবতে শেখেন না, তখন চিকিৎসা পেশার আত্মাটাই ক্ষয়ে যেতে শুরু করে।
বড় ডিগ্রি মানেই বড় চিকিৎসক: এই ভ্রান্ত ধারণার সামাজিক ক্ষতি
বিদেশি ডিগ্রির প্রতিযোগিতা রোগী সমাজের মনোজগতেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। আমাদের দেশে ধীরে ধীরে একটি বিপজ্জনক ধারণা গড়ে উঠেছে “বড় ডিগ্রি মানেই বড় চিকিৎসক, আর বড় চিকিৎসক মানেই ভালো চিকিৎসা।” ফলে দেখা যায়- সামান্য সর্দি, জ্বর বা গ্যাস্ট্রিকের মতো সমস্যাতেও রোগী খোঁজেন “প্রফেসর লেভেল” চিকিৎসক
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের দক্ষ চিকিৎসকদের প্রতি অনাস্থা তৈরি হয় চিকিৎসা ব্যবস্থা অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যয়বহুল ও ভারী হয়ে ওঠে। অথচ চিকিৎসা একটি স্তরভিত্তিক (tier-based) সেবা ব্যবস্থা। অধিকাংশ রোগের চিকিৎসা দক্ষ সাধারণ চিকিৎসক বা জুনিয়র স্পেশালিস্টই যথাযথভাবে দিতে পারেন। বিদেশি ডিগ্রিনির্ভর প্রতিযোগিতা রোগীকে শিখিয়েছে চিকিৎসার মান নয়, ডিগ্রির আকার দেখো। এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে অকার্যকর করার পাশাপাশি রোগীর আর্থিক ও মানসিক শোষণও বাড়াচ্ছে।
আর্থিক চাপ: নীরব মানসিক ক্ষয় ও পেশাগত বিকৃতি
MRCP/MRCS কেন্দ্রিক কোচিং সংস্কৃতির একটি প্রায় অদৃশ্য কিন্তু গভীরভাবে ধ্বংসাত্মক দিক হলো এর আর্থিক চাপ। অধিকাংশ জুনিয়র চিকিৎসক এই সময়টিতে থাকেন কম বেতনের চাকরি, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং পারিবারিক দায়িত্বের সন্ধিক্ষণে। এর মধ্যেই যুক্ত হয়, কোচিং ফি, মক পরীক্ষা, বই ও অনলাইন সাবস্ক্রিপশন, বিদেশে পরীক্ষা দেওয়ার বিপুল ব্যয়। এই অর্থনৈতিক চাপ ধীরে ধীরে জন্ম দেয় স্থায়ী মানসিক উদ্বেগ, আত্মমূল্যবোধের সংকট, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং পেশাগত হতাশা। অনেক চিকিৎসক আরও টাকা খরচ করতে হবে বলেই চাকরি ও রোগীসেবার জায়গায় আপস করেন, অতিরিক্ত কাজ নেন, কখনো অনৈতিক পথেও পা বাড়ান। এভাবে একটি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে আমরা তরুণ চিকিৎসকদের শুধু ক্লান্ত করছি না আমরা তাদের নৈতিক সহনশীলতাকেও ক্ষয় করছি।
অভ্যন্তরীণ শ্রেণিবিভাজন: পেশার ভেতরেই পেশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ
MRCP/MRCS এখন আর কেবল দক্ষতা যাচাইয়ের মাধ্যম নয়; এটি চিকিৎসক সমাজের ভেতরেই এক ধরনের শ্রেণিচিহ্ন হয়ে উঠেছে। “ক্যান্ডিডেট”, “পার্ট পাস”, “লোকাল প্র্যাকটিস” এই শব্দগুলো ধীরে ধীরে পেশাগত পরিচয়ের বদলে সামাজিক পরিচয়ে পরিণত হচ্ছে। ফলে চিকিৎসকদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে সহযোগিতার বদলে প্রতিযোগিতা, মেন্টরশিপের বদলে ঈর্ষা, সম্মানের বদলে তুলনা। চিকিৎসা পেশা যেখানে সমবেত দায়িত্ব ও টিমওয়ার্কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকার কথা, সেখানে এই ভাঙন এক ধরনের পেশাগত আত্মঘাত।
প্র্যাকটিকালের নামে অনৈতিকতা: উন্নত ডিগ্রির অন্ধকার দিক
এই পরীক্ষাগুলোর প্র্যাকটিকাল প্রস্তুতির নামে যে অনৈতিক চর্চাগুলো ঘটে, সেগুলো নিয়ে আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে নীরব থাকি। রোগীর সম্মতি ছাড়া বারবার পরীক্ষা, অসুস্থ মানুষকে প্রশিক্ষণ সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার এসব কোনোভাবেই আধুনিক চিকিৎসা নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এখানে একটি তীব্র নৈতিক দ্বন্দ্ব দাঁড়িয়ে যায় যে উন্নত দেশের সার্টিফিকেটের জন্য আমরা ছুটছি, সেই দেশগুলোর নৈতিক মানদণ্ডই আমরা নিজের দেশে লঙ্ঘন করছি।
চিকিৎসক শূন্যতা: কোচিং রুমে ভিড়, হাসপাতালে নীরবতা
এই সংকটের সবচেয়ে নির্মম প্রতিফলন দেখা যায় দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে। তরুণ চিকিৎসকরা যখন কোচিং ও পরীক্ষার চাপে শহরমুখী হন, তখন সরকারি হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো ক্রমে ফাঁকা হয়ে পড়ে। এই শূন্যতা শূন্যই থাকে না। সেখানে জায়গা করে নেয় কোয়াক চিকিৎসক, ফার্মেসি-নির্ভর চিকিৎসা, অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর ওষুধ। এখানে আর কোনো তাত্ত্বিক বিতর্ক নেই, এটি সরাসরি মানুষের জীবন ও মৃত্যুর প্রশ্ন। একটি রাষ্ট্র যখন তার বৈধ চিকিৎসকদের পরীক্ষার নামে রোগী থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তখন অপচিকিৎসা কোনো বিচ্যুতি নয়, এটি অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।
যখন উন্নত শিক্ষা সমাজে ফিরে আসে না
এই চক্রের শেষ ধাপে দেখা যায় অনেক চিকিৎসক MRCP/MRCS অর্জনের পর বাস্তব চিকিৎসা ব্যবস্থায় যুক্ত না হয়ে কোচিং করানোকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। এতে জ্ঞান তৈরি হয় না, ছড়ায়ও না বরং একই পরীক্ষাকেন্দ্রিক জ্ঞান ঘুরে ঘুরে বিক্রি হয়। ফলে উন্নত শিক্ষা থেকে যে সামাজিক রিটার্ন আসার কথা ছিল উন্নত চিকিৎসা, গবেষণা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন। তার কোনোটিই বাস্তবে ঘটে না।
শেষ কথা: সার্টিফিকেট নয়, সিস্টেমের প্রশ্ন
এই লেখা MRCP বা MRCS-এর বিরুদ্ধে নয়। এই লেখা উৎকর্ষের বিরুদ্ধেও নয়। এই লেখা সেই ভ্রান্ত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে, যেখানে মনে করা হয় বড় ডিগ্রি মানেই বড় চিকিৎসক, আর বড় চিকিৎসক মানেই উন্নত চিকিৎসা।
আসল প্রশ্ন হলো- আমরা কি এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়তে চাই, যেখানে মেধাবী তরুণ চিকিৎসকরা পরীক্ষার চাপে মানসিক ও আর্থিকভাবে ভেঙে পড়বে, নাকি এমন একটি ব্যবস্থা চাই যেখানে তারা দেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বড় হবে? যতদিন আমরা সার্টিফিকেটকে সিস্টেমের বিকল্প ভাববো, ততদিন ক্যারিয়ারের মোড়কে আমরা নীরবে ধ্বংস করবো এই দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকেই।
লেখক পরিচিতিঃ ডা. মোহাম্মদ মাহিদুল ইসলাম জিহাদ, চিকিৎসক, গবেষক ও লেখক, এভিসিনা হেলথকেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট
ইএইচপি
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- চলছে রাজশাহী ওয়ারিয়র্স বনাম সিলেট টাইটান্সের ম্যাচ-দেখুন সরাসরি (LIVE)
- শেয়ারবাজার স্থিতিশীলতায় বড় পদক্ষেপ নিল বিএসইসি
- রাজশাহী বনাম চট্টগ্রাম: ৯০ রানে নেই ৭ উইকেট-দেখুন সরাসরি (LIVE)
- বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে ঢাবি অ্যালামনাইয়ের শ্রদ্ধা
- ঢাকা ক্যাপিটালস বনাম রংপুর রাইডার্স: জমজমাট খেলাটি চলছে-দেখুন সরাসরি
- শেয়ারবাজার আধুনিকীকরণে বিএসইসির গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
- মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজের লোকসানের পাল্লা আরও ভারী হলো
- রাজশাহী বনাম সিলেটের জমজমাট ম্যাচটি শেষ-দেখুন ফলাফল
- অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেশেয়ারবাজার
- প্রত্যাশার বাজারে সূচকের উত্থান অব্যাহত
- স্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতিতে লেনদেন, ডিএসইতে সূচকের শক্ত অবস্থান
- ১০ লাখ শেয়ার কেনার ঘোষণা দিলেন কোম্পানির পরিচালক
- ২৫ লাখ শেয়ার হস্তান্তরের ঘোষণা উদ্যোক্তা পরিচালকের
- সূচক কমলেও স্বস্তিতে বাজার, লেনদেন বেড়েছে
- রংপুর রাইডার্স বনাম ঢাকা ক্যাপিটালসের জমজমাট খেলাটি শেষ-জানুন ফলাফল