ঢাকা, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩

রেকর্ড খেলাপি ঋণে ডুবেছে ব্যাংক: গ্রাহকের জমানো টাকা কি নিরাপদ?

২০২৫ ডিসেম্বর ২৭ ১৬:০২:২৯

রেকর্ড খেলাপি ঋণে ডুবেছে ব্যাংক: গ্রাহকের জমানো টাকা কি নিরাপদ?

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০২৫ সাল বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে একটি মোড় ঘোরানো বছর হয়ে উঠেছে—পুনরুদ্ধারের আশার বদলে এটি পরিণত হয়েছে কঠিন আত্মসমালোচনা ও নগ্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সময়ে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ঋণ লুট, ধারাবাহিক কেলেঙ্কারি ও শিথিল নিয়ন্ত্রণে ফুলে ওঠা ব্যাংকগুলোর ভেতরের ফাঁপা কাঠামো বছর শুরুর সঙ্গেই প্রকাশ পেতে থাকে। রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ, একের পর এক ব্যাংকের টিকে থাকা নিয়ে প্রশ্ন, আমানতকারীদের আস্থাহীনতা এবং উচ্চ সুদের চাপে স্থবির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল হয়ে দাঁড়ায় ব্যাংকিং খাতের জন্য এক নির্মম ‘হিসাব-নিকাশের’ বছর। যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একীভূতকরণ, নতুন আইন ও কঠোর তদারকির মাধ্যমে সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে, তবুও বছর শেষে প্রাপ্ত চিত্র স্পষ্ট করে দিয়েছে—সংস্কারের পথ শুরু হলেও ঝুঁকি এখনো কাটেনি।

সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ। এটি গত এক বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি এবং ২০০০ সালের পর সর্বোচ্চ।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এক ডজনেরও বেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বড় বড় করপোরেট গ্রুপগুলোর খেলাপি হওয়ার প্রবণতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।

এদিকে ব্যাংকিং খাতের এই অস্থিরতা চলেছে প্রতিকূল সামষ্টিক অর্থনীতির মধ্যেই। মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের আশেপাশে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদ হার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখায় ঋণের সুদহার ১৬ থেকে ১৭ শতাংশে পৌঁছায়। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ রেকর্ড পর্যায়ে নেমে আসে এবং নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ে। নিজের জমানো টাকার নিরাপত্তা নিয়ে আমানতকারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক দেখা দেয়।

ব্যাংক একীভূতকরণ ও আমানতকারীদের ভোগান্তি

বছরের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল পাঁচটি সংকটাপন্ন শরিয়াহ ভিত্তিক ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে রাষ্ট্রায়ত্ত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন। ৩০ অক্টোবর লাইসেন্স পাওয়া এই ব্যাংকটি দেশের বৃহত্তম ইসলামী ব্যাংকে পরিণত হয়, যার পরিশোধিত মূলধন ৩৫,০০০ কোটি টাকা (এর মধ্যে ২০,০০০ কোটি টাকা সরকারের)।

যেসব ব্যাংক নিয়ে এই নতুন ব্যাংক গঠিত হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং নজরুল ইসলাম মজুমদারের নাসা গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন এক্সিম ব্যাংক। ব্যাংক একীভূতকরণের সময় শাখাগুলোতে আমানতকারীদের উপচে পড়া ভিড় এবং নগদ অর্থ উত্তোলনে ব্যর্থতা চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তারল্য সহায়তা দিলেও অনেক গ্রাহক তাদের টাকা ফেরত পাননি।

এই সংকট সামাল দিতে সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করে; যার মধ্যে ব্যাংক রেজোলিউশন অধ্যাদেশ ২০২৫: এর মাধ্যমে ব্যর্থ ব্যাংকগুলোর হস্তক্ষেপে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়। এছাড়া আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫: আমানত বিমার পরিমাণ ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়, যা দেশের ৯৩ শতাংশ আমানতকারীকে সুরক্ষা দেবে।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২’ সংশোধনের উদ্যোগ আমলাতান্ত্রিক বাধার মুখে পড়ে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ’ বিলুপ্ত করার দাবি উঠলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

ইতিবাচক দিক: বৈদেশিক খাত

ব্যাংকিং খাতের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মাঝেও স্বস্তি দিয়েছে বৈদেশিক খাত। হুন্ডি ও হাওলার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার ফলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ৩০.০৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়ায় ৩২.৫৭ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি।

২০২৫ সাল শেষ হতে চললেও ব্যাংকিং খাতের সংকট কাটেনি, তবে দীর্ঘদিনের লুকানো ক্ষতগুলো উন্মোচিত হয়েছে। রাজনৈতিক সুরক্ষা দুর্বল হয়েছে এবং ব্যাংকগুলো সংস্কারের প্রাথমিক সরঞ্জামগুলো তৈরি হয়েছে। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মানসিকতাই ঠিক করে দেবে—এই সংস্কার স্থায়ী হবে নাকি ব্যবস্থাটি ভঙ্গুরই থেকে যাবে।

এমজে/

শেয়ারবাজারের বিশ্লেষণ ও ইনসাইড স্টোরি পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

খরচ কমাচ্ছে সরকার: কমছে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা

খরচ কমাচ্ছে সরকার: কমছে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা

নিজস্ব প্রতিবেদক: বৈশ্বিক অস্থিরতা মোকাবিলায় সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাব বিবেচনায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন... বিস্তারিত