×

ঢাকা, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

পুলিশের ভেতরে চক্র নিয়ে রহস্যময় তথ্য

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৭ ১৭:৫০:১৪

পুলিশের ভেতরে চক্র নিয়ে রহস্যময় তথ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: গত কয়েক মাসে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের গোপন বৈঠক, ঝটিকা মিছিল এবং মিছিল থেকে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে গত জুলাই ও চলতি সেপ্টেম্বরে ভারতে অবস্থানরত দলটির সভানেত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন, ডিসেম্বরে তিনি দেশে ফিরবেন। তাঁর ওই ঘোষণার পর বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটির কর্মী-সমর্থকেরা নানা ধরনের প্রচারণাও শুরু করেন।

সরকারের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার পরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রত্যাশিত উন্নতি না হওয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। পুলিশ যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একই সঙ্গে পলাতক পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেশে কর্মরত কিছু পুলিশের যোগাযোগ রয়েছে কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন কেউ কেউ।

এমন পরিস্থিতিতে ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিবুল হাসানের একটি অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে পড়লে পুলিশের একটি অংশের মনোভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। অডিওতে রাকিবকে বলতে শোনা যায়, ‘জানি যে শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আসতেছে। কিচ্ছু হবে না আসলে, কিচ্ছু হবে না। আপনারা তো চিন্তা করতে পারছেন, রাস্তার পুলিশ কত দুর্বল, ভয়ানক দুর্বল।’ তিনি আরও বলেন, ‘ডিসেম্বর দেরি হয়ে গেছে। এই মাসে আসা উচিত ছিল। চলে আসলে এই পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না। সিনিয়র অফিসার সব বিএনপি করতেছে। আমরা তো বিএনপি করতেছি না। এই করার জন্য তো আমরা ডিপার্টমেন্টে আসি নাই।’ অডিওটি নিয়ে রাকিবুলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয় এবং ২৪ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।

ক্ষমতায় আসার শুরুতে সরকার কিছুটা উদার অবস্থান নিলেও পরিস্থিতির কারণে এখন কঠোর অবস্থানে যেতে হচ্ছে। বিশেষ করে গণ-অভ্যুত্থানে পরাজিত আওয়ামী লীগের হুমকি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং পুলিশের শৃঙ্খলা—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর পালিয়ে যাওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেশে কর্মরত কিছু পুলিশের গোপন যোগাযোগের বিষয়টি আলোচনায় আসায় সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে বলে জানা যায়।

রাকিবুলের বক্তব্যের পর সরকারের শীর্ষ মহলে বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসার পরিস্থিতি তৈরি হয়। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকা পুলিশের ‘গুপ্ত’ সদস্যদের তৎপরতা খতিয়ে দেখার কাজ শুরু হয়। নীতিনির্ধারক পর্যায়ে আলোচনা ও পর্যালোচনার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পুলিশবাহিনী সম্পর্কেও সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

ক্ষমতায় আসার পর গত সাত মাসে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে অভিযান বা কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তবে শনিবার গুলিস্তানে জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ সন্দেহে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে।

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো পুলিশ সদস্য ফ্যাসিবাদ চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে কিংবা শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভার্চুয়াল জগতে অপপ্রচার ঠেকাতে বিশেষ আইন প্রয়োগ এবং নতুন ‘সাইবার ইউনিট’ গঠনের প্রক্রিয়াও জোরদার করা হয়েছে। ঘাপটি মারা পুলিশ সদস্যদের শনাক্ত করতে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে একটি বিশেষ সেল কাজ করছে। নাশকতার পরিকল্পনা ঠেকাতে ডিএমপি, ডিবি, সিটিটিসি ও বিশেষায়িত ব্যাটালিয়নগুলোর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান এবং চেকপোস্ট কার্যক্রমও বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। পুলিশের উদ্দেশে সরকারের পক্ষ থেকে কড়া বার্তাও দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে থাকা সুবিধাবাদী কর্মকর্তা ও ‘গুপ্তরা’ আবারও তৎপর হয়ে উঠছেন। কর্মরত পুলিশের মিড লেভেল এবং কিছু স্পর্শকাতর থানায় পুরোনো নেটওয়ার্কের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি রাকিবুল হাসানের অডিও রেকর্ডকে এর একটি বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অতি স্পর্শকাতর একটি থানা এলাকায় পুরোনো ব্যবস্থার প্রতি অনুগত মনোভাব বজায় রেখে ওসি ও তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন বলে জানা যায়।

কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও পুলিশি চেকপোস্টের মধ্যেও রাজধানীর গুলশান, উত্তরা, পল্টন, ধানমন্ডিসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিষিদ্ধ দলের ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার তদন্তে মাঠপর্যায়ের কিছু পুলিশ সদস্যের তথ্য গোপনের বিষয় সামনে এসেছে বলে জানা যায়। পুলিশের ভেতরে থাকা ওই ‘গুপ্ত’ সিন্ডিকেট নিষিদ্ধ দলের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পালিয়ে যাওয়া পুলিশের সাবেক শীর্ষ ও মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ বাড়ছে বলে জানা গেছে।

রাজপথের পাশাপাশি ভার্চুয়াল জগতেও অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো, এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া অডিও-ভিডিও তৈরি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করার চেষ্টা চলছে বলে তাদের ভাষ্য।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি বিশেষ ও স্বতন্ত্র ‘সাইবার ইউনিট’ গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দেশবিরোধী অপপ্রচার ও গুজব দ্রুত শনাক্ত করে প্রতিহত করা হবে এই ইউনিটের মূল কাজ। সাইবার অপরাধীদের আইপি অ্যাড্রেস ও মূল উৎস শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তারের ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল সিকিউরিটি সংক্রান্ত আইনি কাঠামো কাজে লাগিয়ে ত্বরিত বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

নতুন সাইবার ইউনিটকে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান। তাঁর ভাষ্য, রাজপথের তুলনায় এখন সাইবার স্পেসে বেশি বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। এ ধরনের অপতৎপরতা ঠেকাতে বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন জনবল নিয়োগ এবং ট্র্যাকিং সিস্টেম চালুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরিতে বিশাল অঙ্কের অর্থ ‘ফ্যাসিবাদ’ সরকারের সময় অবৈধভাবে গড়ে তোলা সম্পদ থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকার এই অর্থায়নের নেটওয়ার্ক ধ্বংসে কাজ শুরু করেছে। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত পলাতক নেতা ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারি বাড়াতে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের ঝটিকা মিছিল ও গোপন তৎপরতার পেছনে পুলিশের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু সদস্যের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগসাজশের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। কূটনৈতিক জোন গুলশানসহ সংবেদনশীল এলাকায় কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও কীভাবে এসব মিছিল হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে শৃঙ্খলা ফেরানো ও অপরাধ দমনের কাজে পুলিশের ভেতরে থাকা ওই চক্র নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ঝটিকা মিছিল বা নাশকতার ঘটনা মাঝেমধ্যে ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ আগাম তথ্য দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ঘাপটি মারা চক্রটি ইচ্ছাকৃতভাবে গোয়েন্দা নেটওয়ার্কে ব্লক বা অন্ধত্ব তৈরি করছে। উল্টো অপরাধীদের আগাম তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে। নিজেদের অপকর্ম আড়াল করা এবং বাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে দিতে তারা নানা ধরনের অপতথ্যও ছড়াচ্ছে। এতে সৎ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের মধ্যেও মানসিক অস্বস্তি ও আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মাঠপর্যায়ের পুলিশিং কার্যক্রমে।

পুলিশের সাবেক আইজি আব্দুল কাইয়ুম বলেন, পুলিশবাহিনীতে ঘাপটি মেরে থাকা ‘গুপ্ত’ সিন্ডিকেটের তৎপরতা স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসির অডিও-কাণ্ড এবং বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিলের পেছনে পুলিশের অসাধু সদস্যদের যোগসাজশের অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তিনি বলেন, কোনো মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্য অপরাধীদের আগাম তথ্য দিয়ে সহায়তা করলে তা শুধু পেশাদারির লঙ্ঘন নয়, সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তাঁর মতে, সরকারের বর্তমান হার্ডলাইন নীতি, বিশেষ করে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত এবং স্বতন্ত্র ‘সাইবার ইউনিট’ গঠনের উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ।

এক প্রশ্নের জবাবে আব্দুল কাইয়ুম বলেন, দুষ্টচক্রের পেছনে থাকা অবৈধ অর্থায়নের নেটওয়ার্ক এবং পলাতক মাস্টারমাইন্ডদের আন্তর্জাতিক সহায়তায় আইনের আওতায় আনতে হবে।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত