×

ঢাকা, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

ফাতেহায়ে ইয়াজদাহম: প্রচলন, ঐতিহাসিক ভিত্তি ও শরয়ি দৃষ্টিভঙ্গি

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৩ ১৪:২১:৪৫

ফাতেহায়ে ইয়াজদাহম: প্রচলন, ঐতিহাসিক ভিত্তি ও শরয়ি দৃষ্টিভঙ্গি

ডুয়া ডেস্ক: রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখে উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘ফাতেহায়ে ইয়াজদাহম’ নামে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের প্রচলন রয়েছে। বিশেষ করে সুফি সাধক ও পীর-মাশায়েখের অনুসারীদের মধ্যে এ আয়োজন বেশি দেখা যায়। এ উপলক্ষে কোথাও কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল করা হয়, কোথাও মসজিদ ও বিভিন্ন স্থাপনা আলোকসজ্জায় সাজানো হয়। আবার কোনো কোনো স্থানে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও খাবার বিতরণের আয়োজনও থাকে।

সাধারণত অনুষ্ঠানটি বড়পীর হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর ওফাত দিবস স্মরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে মনে করা হয়। তবে ফাতেহায়ে ইয়াজদাহমের প্রচলন, এর ঐতিহাসিক ভিত্তি এবং শরিয়তের দৃষ্টিতে এর মর্যাদা বোঝার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোনো বুযুর্গ ব্যক্তির প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ এবং নির্দিষ্ট একটি দিনকে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার জন্য নির্ধারণ এ দুটি বিষয় এক নয়।

ফাতেহায়ে ইয়াজদাহম কী

‘ইয়াজদাহম’ ফারসি শব্দ, যার অর্থ এগারো। অন্যদিকে ‘ফাতেহা’ বলতে সাধারণত দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত, সওয়াবের উদ্দেশ্যে কোনো আমল কিংবা এ উপলক্ষে আয়োজিত ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে বোঝানো হয়। এ অর্থে ‘ফাতেহায়ে ইয়াজদাহম’ হলো এগারো তারিখের ফাতেহা।

প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখ বড়পীর হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর ওফাত স্মরণে এ অনুষ্ঠান পালন করা হয়। ইসলামের ইতিহাসে তিনি একজন প্রসিদ্ধ আলেম, সাধক ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থে তাঁর ইলম, তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি, দাওয়াতি কার্যক্রম এবং মানুষের নৈতিক সংশোধনে তাঁর অবদানের কথা আলোচিত হয়েছে।

হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা এবং তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ মুসলিমদের জন্য প্রশংসনীয় বিষয়। তবে কোনো আলেম, সাধক বা বুযুর্গের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের পদ্ধতি শরিয়তের নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি। কোনো ব্যক্তির মর্যাদা যত উঁচুই হোক, তাঁকে স্মরণ করে নতুন কোনো ধর্মীয় রীতি চালু করতে কোরআন-সুন্নাহর ভিত্তি থাকা আবশ্যক।

ফাতেহায়ে ইয়াজদাহমের ঐতিহাসিক ভিত্তি কতটুকু

ফাতেহায়ে ইয়াজদাহমের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হলো ১১ রবিউস সানি কি হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর মৃত্যুদিবস? প্রচলিত বিশ্বাসে দিনটিকে তাঁর ওফাত দিবস বলা হলেও ঐতিহাসিক সূত্র পর্যালোচনায় তাঁর ইন্তেকালের তারিখ নিয়ে ইতিহাসবিদ ও জীবনীকারদের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়।

তাঁর জীবনীগ্রন্থ ‘তাফরীহুল খাতির ফি মানাকিবিশ শায়খ আবদুল কাদির’-এ ইন্তেকালের তারিখ হিসেবে একাধিক মত উল্লেখ রয়েছে। সেখানে রবিউস সানির ৭, ৯, ১০, ১১, ১৩, ১৭ ও ১৮ তারিখের কথা পাওয়া যায়। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় রবিউল আউয়াল মাসের ১০ তারিখের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লিখিত গ্রন্থে বিভিন্ন মতের মধ্যে রবিউস সানির ১০ তারিখকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ আছে। (দেখুন: ফাতাওয়া রহিমিয়া, ২/৭৬–৭৭)

প্রসিদ্ধ ইতিহাসবিদ আল্লামা শামসুদ্দিন আজ-জাহাবি (রহ.) তাঁর ‘তারিখুল ইসলাম’ গ্রন্থে লিখেছেন:

توفي في عاشر ربيع الآخر سنة إحدى وستين، وله تسعون سنة

‘তিনি ৫৬১ হিজরির রবিউস সানি মাসের ১০ তারিখে ৯০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।’ (তারিখুল ইসলাম, ২৯/৬০)

এসব তথ্যের ভিত্তিতে ১১ রবিউস সানিকে হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর নিশ্চিত মৃত্যুদিবস হিসেবে উল্লেখ করার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক সংশয় রয়েছে। তবে কারও মৃত্যুর তারিখ নিয়ে মতভেদ থাকলেও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো বা তাঁর জীবনী আলোচনা নিষিদ্ধ হয় না। কিন্তু কোনো একটি নির্দিষ্ট তারিখকে তাঁর ওফাত দিবস ধরে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার জন্য নির্ধারণ করতে হলে এর ঐতিহাসিক ভিত্তির পাশাপাশি শরিয়তসম্মত প্রমাণও বিবেচনা করা দরকার।

জন্মদিবস ও মৃত্যুদিবস পালনের শরয়ি ভিত্তি

ইসলামে ইবাদত, ধর্মীয় উৎসব এবং বিশেষ ফজিলতপূর্ণ সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা মৌলিক ভিত্তি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে, খোলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবায়ে কেরামের আমলে কোনো নবী, রাসুল, সাহাবি বা বুযুর্গের জন্মদিবস কিংবা মৃত্যুদিবস প্রতিবছর বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে পালনের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন প্রবর্তন করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (বুখারি, হাদিস : ২৬৯৭; মুসলিম, হাদিস : ১৭১৮)

আরেক বর্ণনায় তিনি বলেছেন: ‘প্রত্যেক নতুন উদ্ভাবিত বিষয় বিদআত এবং প্রত্যেক বিদআত পথভ্রষ্টতা।’ (মুসলিম, হাদিস : ৮৬৭)

এই হাদিসগুলোর ভিত্তিতে আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন, দ্বীনের মধ্যে নতুন কোনো ইবাদত বা ধর্মীয় রীতি চালু করার জন্য শরিয়তের অনুমোদন থাকা জরুরি। কোনো কাজ সাধারণভাবে ভালো মনে হলেও সেটিকে নির্দিষ্ট দিন, নির্দিষ্ট পদ্ধতি এবং বিশেষ ধর্মীয় মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করতে পৃথক দলিলের প্রয়োজন হয়।

কোনো বুযুর্গের জীবনী আলোচনা, তাঁর নেক আমলের কথা স্মরণ বা তাঁর জন্য দোয়া করা এক বিষয়; আর তাঁর জন্ম বা মৃত্যুর দিনকে প্রতিবছর বিশেষ ধর্মীয় দিবস হিসেবে পালন করা ভিন্ন বিষয়। শরিয়তের আলোচনায় এ দুই বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক নয়।

মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া ও ঈসালে সওয়াবের শরয়ি উপায়

মৃত মুসলিমদের জন্য দোয়া, ইস্তিগফার ও সদকার প্রতি ইসলামে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে মুমিনদের একটি দোয়া এভাবে এসেছে: ‘হে আমাদের রব! আমাদের এবং আমাদের পূর্বে ঈমান নিয়ে চলে যাওয়া ভাইদের ক্ষমা করুন।’ (সুরা হাশর, আয়াত : ১০)

এ আয়াত থেকে পূর্ববর্তী মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা ইসলামে স্বীকৃত আমল এ কথা বোঝা যায়। একইভাবে মৃত ব্যক্তির জন্য সদকা করা, তাঁর ঋণ পরিশোধে সহযোগিতা করা এবং তাঁর কল্যাণের জন্য দোয়া করাও নেক কাজের অন্তর্ভুক্ত।

তাই আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর জন্য দোয়া করা, তাঁর জীবনী পাঠ করা, তাঁর ইলম ও তাকওয়া থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং তাঁর নামে সদকা করা বৈধ নেক আমলের মধ্যে পড়তে পারে। এসব আমল করার জন্য রবিউস সানির ১১ তারিখকে শরিয়ত নির্ধারিত বিশেষ দিন হিসেবে বিবেচনা করার প্রয়োজন নেই।

বছরের যেকোনো দিন তাঁর জীবনী আলোচনা করা, তাঁর শিক্ষাকে মানুষের সামনে তুলে ধরা এবং তাঁর জন্য দোয়া করা যায়। নেককার বুযুর্গদের প্রকৃত সম্মান হলো তাঁদের জীবনাদর্শ অনুসরণ, তাঁদের উপদেশ অনুযায়ী নিজেদের সংশোধন এবং সমাজে কল্যাণকর কাজে অংশ নেওয়া।

হজরত আবদুল কাদির জিলানি (রহ.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের পথ হিসেবে তাঁর জীবন ও শিক্ষার আলোকে নিজেকে সংশোধন করা, সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং সমাজে ন্যায়, সততা ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো দিবসের আনুষ্ঠানিকতার তুলনায় এই আদর্শ অনুসরণ একজন বুযুর্গের স্মৃতির প্রতি আরও ফলপ্রসূ সম্মান প্রদর্শনের পথ হতে পারে।

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত