ঢাকা, শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩
হিমবাহ ধসেই নেপালের ভয়াবহ বন্যা, বলছেন বিজ্ঞানীরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যার কারণ হিসেবে প্রাথমিক তদন্তে একটি হিমবাহ ধসে পড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এতে হিমালয়ের বরফ দ্রুত গলে যাওয়ার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ভূমিকম্পের প্রাথমিক খবর পাওয়ার পর অনেকে ধারণা করেছিলেন, ভূকম্পনের কারণে ভূমিধস হয়েছিল এবং সেখান থেকেই বন্যার সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় অন্তত ৪৮৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) পরে জানায়, ‘হিমবাহ ধসে পড়া’র কারণে এই দুর্যোগের সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ কোনো হিমবাহ বা তার একটি অংশ ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।
ইউএসজিএসের তথ্য এবং ঘটনাটি বিশ্লেষণ করা বিজ্ঞানীদের মতে, ধসে পড়া হিমবাহ উপত্যকার তলদেশে আঘাত করার সময় প্রচণ্ড অভিঘাত তৈরি হয়েছিল। এত শক্তিশালী ছিল সেই অভিঘাত যে তা ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূকম্পন হিসেবে রেকর্ড হয়।
ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ড. সাইমন কুক বিবিসিকে বলেন, তাঁর দলের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নেপালের লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে একটি হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়েছে। জায়গাটি বন্যাকবলিত এলাকা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে। হিমবাহটি উত্তর-পশ্চিম দিকে ধসে পড়ে। এরপর পানির স্রোতের সঙ্গে সেটি পশ্চিম দিকে নিচে নেমে আসে।
আন্তঃসরকারি বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (আইসিআইএমওডি) এক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, অনেক উঁচু কোনো এলাকা থেকে বরফ ও পাথরের ধস নেমে থাকতে পারে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথরের ধ্বংসাবশেষ ভোটেকোশী নদীর একটি শাখা নদী লেন্দে খোলায় গিয়ে পড়ে। এতে নদীতে হঠাৎ প্রবল পানির স্রোত তৈরি হয়। সেই স্রোত পানি, পলি ও বড় বড় পাথর ভাটির দিকে বয়ে নিয়ে যায়।
আইসিআইএমওডির বিশ্লেষণ বলছে, মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে ভাটির দিকের নদীগুলোতে পানির উচ্চতা ৭ থেকে ৯ মিটার বেড়ে যায়। পানির প্রবল স্রোতে কয়েকটি পানি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ভেসে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ সায়েন্সেসের অধ্যাপক মাইক সার্ল বলেন, ভূমিধস থেকে বন্যা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েক ঘণ্টা, এমনকি কয়েক দিনও সময় লাগতে পারে।
তিনি বলেন, ধ্বংসাবশেষের বিপুল ঢেউ দেখে মনে হচ্ছে, প্রথমে ভূমিধস হয়েছিল। এরপর পানি জমে নদীর প্রবাহ আটকে যায়। শেষ পর্যন্ত সেই বাঁধ ভেঙে বিশাল বন্যার সৃষ্টি হয়। এলাকার ভূপ্রকৃতিও বন্যার ভয়াবহতা বাড়িয়ে থাকতে পারে। লাংটাং লিরুং উচ্চ হিমালয়ের চূড়ায় অবস্থিত। পর্বতটির দুই পাশে রয়েছে অত্যন্ত খাড়া উপত্যকা। এসব উপত্যকার কারণে পানি আরও বেশি গতিতে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়ে থাকতে পারে। তবে হিমবাহটি কেন ধসে পড়েছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সার্ল বলেন, হিমালয়ের অন্যান্য এলাকার মতো লাংটাং লিরুংও দীর্ঘমেয়াদি টেকটোনিক গতিবিধির কারণে ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে। এ প্রক্রিয়ায় একটি ভূত্বকীয় প্লেট আরেকটি প্লেটকে ওপরে ঠেলে দেয়। তিনি বিষয়টিকে গাড়ির নিচে জ্যাক বসিয়ে সেটিকে ওপরে তোলার সঙ্গে তুলনা করেন।
সার্লের মতে, পর্বত যত ওপরে উঠছে, হিমবাহও তত খাড়া হয়ে উঠছে। ফলে এর কিছু অংশ খসে পড়া স্বাভাবিক। সাধারণত এ ধরনের ঘটনায় তুলনামূলক ছোট ছোট বরফের খণ্ড খসে পড়ে। এগুলো সাময়িকভাবে নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। পরে পানির স্রোতে সহজেই ভেসে যায়। কিন্তু এবারের দুর্যোগে মনে হচ্ছে, পুরো হিমবাহটি একসঙ্গে ধসে পড়েছে। সার্লের ভাষায়, এটি ‘খুবই অস্বাভাবিক’ ঘটনা।
তিনি বলেন, এ ধরনের বন্যা সব সময়ই হয়। তবে এত বড় মাত্রায় সাধারণত হয় না।
সার্লের মতে, বুধবারের ঘটনাটি সম্ভবত দুটি ভিন্ন প্রক্রিয়ার কারণে ঘটেছে। একদিকে হিমালয়ের ভূত্বকীয় গতিবিধির কারণে পর্বতশ্রেণি ওপরে উঠছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে এবং হিমবাহ গলে যাচ্ছে। এসব বিষয় একসঙ্গে মিলে এমন ভয়াবহ দুর্যোগ তৈরি করছে, যা এখন নিয়মিতই দেখা যাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ে বরফ ও পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ার বিষয়ে বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে সতর্ক করে আসছেন। পারমাফ্রস্ট বলতে শত শত বছর ধরে জমাট হয়ে থাকা মাটিকে বোঝায়।
চলতি বছরের শুরুতে আইসিআইএমওডি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০০ সালের তুলনায় বর্তমানে হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো দ্বিগুণ হারে বরফ হারাচ্ছে। এর ফলে বন্যাসহ বিভিন্ন ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
ড. কুক বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত, সুইজারল্যান্ড ও ইতালিতেও হিমবাহ ধসে বন্যা ও ভূমিধসের একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
২০২১ সালে উত্তর ভারতের চামোলি উপত্যকায় হিমালয়ের একটি হিমবাহের বড় একটি অংশ ধসে পড়ে। এতে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ ও পানি ভাটির দিকে নেমে আসে। ওই ঘটনায় প্রায় ২০০ জনের মৃত্যু হয়।
পরে বিজ্ঞানীরা হিসাব করে জানান, ওই ধসের অভিঘাত ছিল ১৫টি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের সমতুল্য। এমনকি নেপালেও একই অঞ্চলে গত বছর তিব্বতে একটি হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের বাঁধ ভেঙে বন্যা হয়েছিল।
আইসিআইএমওডির বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফারুক আজম বলেন, ক্রায়োস্ফিয়ারে অর্থাৎ পৃথিবীর হিমায়িত অংশগুলোতে বিপদের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন এসব ঘটনা আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। পরিবর্তনের গতিও অনেক দ্রুত। তবে কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটেছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা।
ড. কুক বলেন, এসব ঘটনার ধরন দেখলে মনে হতে পারে, এর পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে। পৃথিবী উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহের আকার ছোট হবে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ তুষার গলবে। কিছু পর্বতের ঢালকে আংশিকভাবে ধরে রাখা পারমাফ্রস্টও উষ্ণ হয়ে গলতে ও ক্ষয় হতে শুরু করছে।
এর ফলে আরও বেশি ভূমিধস, ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ, হিমবাহের গলিত পানি এবং হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের পানি উপচে পড়ার ঘটনা ঘটতে পারে। একই সঙ্গে বাড়তে পারে হিমবাহ ধসে পড়ার ঝুঁকিও। কারণ শেষ পর্যন্ত জলবায়ুর উষ্ণতা উচ্চ পার্বত্য এলাকার পরিবেশকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।
ইএইচপি
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (২৩ আগস্ট)
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (২৫ আগস্ট) r
- ৭ কলেজের শিক্ষার্থীদের ডিসিইউতে স্থানান্তরের রোডম্যাপ প্রকাশ
- মেয়েরা বাস কেন চালাতে পারবে না: বর্ষা
- এইচএসসির ফল প্রকাশের তারিখ নিয়ে যা জানা গেল
- ৬০ লাখ বাংলাদেশির সিভি ডার্ক ওয়েবে বিক্রির দাবি
- রোববার ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বন্ধ থাকবে যেসব এলাকায়
- জামায়াতের ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠন, প্রধানমন্ত্রী ডা. শফিকুর রহমান
- স্বাস্থ্য খাতে এক লাখ কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ
- মেহেরপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়োগ
- বাংলাদেশ স্কাউটসে নবম গ্রেডে চাকরির সুযোগ
- তেজগাঁও কলেজে মঞ্চে উঠছে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’
- ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার তারিখ জানাল শিক্ষা মন্ত্রণালয়
- বোর্ড সচিব বাবা, টেনেটুনে পাস করা ছেলের ফল জিপিএ-৫
- টাকার বিনিময়ে ১২০০ শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন