ঢাকা, রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩

মিলাদুন্নবী না মানলে কি স্ত্রী তালাক হয়ে যায়? যা বললেন আহমাদুল্লাহ

২০২৬ আগস্ট ২৩ ১৭:৩২:০৮

মিলাদুন্নবী না মানলে কি স্ত্রী তালাক হয়ে যায়? যা বললেন আহমাদুল্লাহ

নিজস্ব প্রতিবেদক: রবিউল আউয়াল মাস এলেই মুসলিম সমাজে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জন্ম, তাঁর প্রতি ভালোবাসা এবং ঈদে মিলাদুন্নবী পালন নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা শুরু হয়। এ সময় কখনো কখনো এমন কথাও শোনা যায়-মিলাদুন্নবীকে বিদআত বললে কেউ কাফের হয়ে যাবে কিংবা তা অস্বীকার করলে স্ত্রীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। সম্প্রতি এক ইসলামি প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে এমনই একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ।

ওই ব্যক্তি জানতে চান, ঈদে মিলাদুন্নবী পালনকে যারা বিদআত বলবেন, তাঁরা কাফের হয়ে যাবেন এবং তাঁদের স্ত্রী স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক হয়ে যাবে—এ কথা সত্য কি না। পাশাপাশি রবিউল আউয়াল মাসে কী কী আমল করা উচিত, সে বিষয়েও জানতে চান তিনি।

উত্তরে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, হিজরি বর্ষের মাসগুলোর মধ্যে রবিউল আউয়াল তৃতীয় মাস। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই মাস রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের মাস এবং বহু ইতিহাসবিদের মতে তাঁর জন্মেরও মাস। তবে তাঁর জন্মের সঠিক তারিখ বা মাস নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, ওই সময় মানুষের মধ্যে জন্মতারিখ সংরক্ষণের প্রচলন বর্তমান সময়ের মতো ছিল না। আজ থেকে ২০ বা ৩০ বছর আগেও গ্রাম-গঞ্জে সন্তান জন্মের সুনির্দিষ্ট তারিখ অনেকে লিখে রাখতেন না। বর্তমানে জন্মনিবন্ধনের কারণে বিষয়টি নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে। তাঁর মতে, ইতিহাস যত পেছনের দিকে যায়, জন্মতারিখ সংরক্ষণের বিষয়টি তত শিথিল ছিল।

তিনি বলেন, বিশ্বনবী (সা.) যখন জন্মগ্রহণ করেন, তখন তিনি আল্লাহর কিতাব ও জ্ঞানে নবী ছিলেন; কিন্তু মক্কার কোরায়শরা তা জানত না। তারা অন্যান্য সাধারণ শিশুর মতোই একটি শিশুর জন্ম হয়েছে বলে মনে করেছিল। ফলে একজন নবীর আগমনের বিষয়টি তখন বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট ছিল না। অন্যদিকে, তাঁর ইন্তেকালের সময় সমগ্র বিশ্ব জেনে গিয়েছিল যে তিনি আল্লাহর চূড়ান্ত রাসুল। এ কারণেই তাঁর ওফাতের তারিখ যেভাবে সংরক্ষিত হয়েছে, জন্মের দিনটি সেভাবে সুনির্দিষ্টভাবে সংরক্ষিত হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, রবিউল আউয়াল মাসেই যদি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্ম ও মৃত্যু হয়ে থাকে, তবুও এ মাসের জন্য আলাদা কোনো বিশেষ আমল বা ইবাদত নির্ধারিত নেই বলে তিনি মনে করেন। ইসলামের মূল নির্দেশ হলো সারা বছর ও সারাজীবন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা, তাঁকে সব সৃষ্টির চেয়ে বেশি ভালোবাসা এবং তাঁর আদর্শ নিজের জীবনে ধারণ করা। এসব অনুসরণ করতে পারলে কিয়ামতের ময়দানে তাঁর শাফাআত ও জান্নাতের নেয়ামত পাওয়ার আশা করা যায় বলে তিনি বলেন।

তিনি বলেন, শুধু রবিউল আউয়াল মাস এলে দু-একটি মিলাদ পড়া, কিয়াম করা বা মহব্বতের নামে কিছু প্রথা পালন করে দায়িত্ব শেষ হয়েছে মনে করা বড় ভুল। রবিউল আউয়াল চলে গেলে নবীজিকে ভুলে যাওয়াকে অনুসরণ বলা যায় না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইসলামি বর্ষপঞ্জির চারটি হারাম বা মর্যাদাপূর্ণ মাস—জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব—এবং রমজান মাসের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। এগুলো ছাড়া বাকি মাসগুলোর বিধান সমান এবং এসব মাসের জন্য আলাদা কোনো নির্দিষ্ট আমল নির্ধারিত নেই।

শায়খ আহমাদুল্লাহ আরও বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের দিন ছিল সোমবার। সুযোগ থাকলে প্রতি সোমবার নফল রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি সুন্নাহ। নবীজি (সা.) নিজে সোমবার রোজা রাখতেন এবং এর কারণ জানতে চাইলে তিনি এই দিনে জন্মগ্রহণের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মকে কেন্দ্র করে কিছু করতে চাইলে সুন্নাহসম্মত উপায় হলো সারা বছর প্রতি সপ্তাহে সোমবার রোজা রাখা।

বছরে একদিন সাড়ম্বরে ‘জন্মবার্ষিকী’ পালনের সংস্কৃতি রাসুলুল্লাহ (সা.) কিংবা তাঁর সাহাবিদের যুগে ছিল না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জন্মদিবস বা বার্ষিকী পালনের এই রীতি মূলত পৌত্তলিক বা প্রকৃতিপূজারীদের সংস্কৃতি থেকে এসেছে। একসময় খ্রিস্টানরাও এর বিরোধিতা করলেও পরবর্তীকালে ঈসা (আ.)-এর নামে ক্রিসমাস বা জন্মোৎসব উদযাপন শুরু করে। তাঁদের অনুসরণ করে একশ্রেণির মুসলিমও নবীর জন্মদিবস উদযাপনের ধারণা গ্রহণ করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অমুসলিমদের অনুকরণ সম্পর্কে সতর্ক করার বক্তব্যের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ৬৩ বছর এবং তাঁর চার খলিফাসহ সাহাবিরা পরবর্তী বহু বছর ইসলাম পরিচালনা করেছেন। মহানবী (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের এই দীর্ঘ সময়েও এক বছরের জন্য নবীজির জন্মদিবস পালনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর মতে, আল্লাহর কাছে প্রশংসিত সাহাবিদের চেয়ে আমরা নবীজিকে (সা.) বেশি ভালোবাসি—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। তাই নবীজি নিজে ও তাঁর সাহাবিরা যা করেননি, তা অন্যদের দেখে অনুকরণ করা ইসলাম নয়; বরং ইসলামের নামে বিভ্রান্তি।

নবীজির প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ সুন্নাহর নীতি মেনে হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে কোরআনের সুরা আলে ইমরানের ৩১ নম্বর আয়াত উল্লেখ করে তিনি বলেন—

قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ

‘বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমার অনুসরণ কর; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৩১)

তিনি বলেন, এই আয়াত আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার দাবির বাস্তব প্রমাণ হিসেবে রাসুল (সা.)-এর অনুসরণের গুরুত্ব তুলে ধরে। তাঁর মতে, রাসুলের (সা.) সুন্নাহ মেনে চলাই আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রমাণের মাপকাঠি।

শায়খ আহমাদুল্লাহর বক্তব্য অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে দুটি বিষয় আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়েছেন-আল্লাহর কিতাব ও তাঁর সুন্নাহ। কোনো আমল যদি এ দুটির মধ্যে না থাকে, তবে দ্বীনের নামে নতুন উদ্ভাবিত বিষয়কে ‘বিদআত’ বলা হয়, যার পরিণতি গোমরাহী ও জাহান্নাম বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মিলাদুন্নবী উদযাপনকারী মুসলিমদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁরা নিশ্চয়ই নবীজির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আবেগ থেকেই তা করেন এবং এই ভালোবাসা প্রশংসনীয়। তবে তাঁর মতে, ভালোবাসার চর্চা সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিতে হওয়া উচিত। এ বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে ইগো বা কাদা ছোড়াছুড়ি না করে বিনয়ের সঙ্গে সত্য তুলে ধরতে হবে। ভিন্নমত পোষণকারী কেউ ভুল করলে তাঁর প্রতি ক্ষোভ বা শত্রুতার পরিবর্তে সহানুভূতি ও দয়ার মানসিকতা রাখা উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

‘মিলাদুন্নবীকে বিদআত বললে মানুষ কাফের হয়ে যাবে বা স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে’-এমন বক্তব্যকে অত্যন্ত অযৌক্তিক বলে অভিহিত করেন শায়খ আহমাদুল্লাহ। তাঁর মতে, কেউ হয়তো বোঝাতে চান যে নবীজির অবমাননা বা দুশমনি করলে ঈমান থাকে না। কিন্তু সুন্নাহকে কঠোরভাবে আঁকড়ে ধরে নতুন উদ্ভাবিত সংস্কৃতি থেকে বিরত থাকা নবীজির আনুগত্য, নাকি তাঁর অবমাননা—এ প্রশ্নও তিনি তোলেন।

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু তৈরি করলে তা বাতিল। সেই আশঙ্কায় কেউ যদি সাহাবিদের যুগে না থাকা কোনো সংস্কৃতি থেকে বিরত থাকেন, তাহলে সেটিকে তিনি অনুসারী হওয়ার প্রমাণ হিসেবেই দেখেন।

বিষয়টি বোঝাতে একটি উদাহরণ দেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কাউকে যদি বলা হয়, ‘আপনি যদি ভালো মানুষ হন, তবে আমাকে এক কাপ চা খাওয়ান’, এরপর সে চা না খাওয়ালে তাকে খারাপ মানুষ হিসেবে ফতোয়া দেওয়া যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি মিলাদুন্নবী উদযাপন না করলেই কাউকে ‘নবীর দুশমন’ আখ্যা দেওয়াও ভিত্তিহীন ও মনগড়া।

শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, রবিউল আউয়াল মুসলিমদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই পৃথিবীতে এমন একজন মহান রাসুল (সা.) এসেছিলেন, যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ মানবজাতির জন্য হিদায়াতের পথ পূর্ণ করেছেন। তাঁর জন্ম মানবতার জন্য এক বিরাট নিয়ামত এবং তাঁর রিসালাত আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ অনুগ্রহগুলোর একটি। তবে সেই নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা শুধু একটি নির্দিষ্ট দিনে আবেগ প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয় বলে তিনি মনে করেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে ভালোবাসার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ তাঁর আদর্শ নিজের জীবনে ধারণ করা-নামাজে, চরিত্রে, পরিবারে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, মানুষের সঙ্গে আচরণে, ন্যায়বিচারে এবং আল্লাহর আনুগত্যে-বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তাঁর মতে, রবিউল আউয়াল এলে প্রত্যেকের নিজের কাছে প্রশ্ন করা উচিত-শুধু নবীজির জন্মের কথা স্মরণ করা হচ্ছে, নাকি তাঁর জীবনাদর্শও অনুসরণ করা হচ্ছে?

তিনি বলেন, যে ভালোবাসা মানুষকে সুন্নাহর দিকে নিয়ে যায়, চরিত্র সুন্দর করে, গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং আল্লাহর আনুগত্যে উদ্বুদ্ধ করে, সেই ভালোবাসাই সবচেয়ে মূল্যবান।

শেষে আল্লাহ তাআলা সবাইকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সত্যিকারের ভালোবাসা, তাঁর সুন্নাহ বুঝে অনুসরণ এবং মতভেদের মধ্যেও মুসলিম ভ্রাতৃত্ব, শালীনতা ও সহনশীলতা বজায় রাখার তৌফিক দান করুন-এই দোয়া করেন তিনি।

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (২৩ আগস্ট)

আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (২৩ আগস্ট)

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) সর্বশেষ ভরিতে ৫ হাজার ৪৮২ টাকা... বিস্তারিত