ঢাকা, শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

‘মুক্তিযুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ ছিল না’

২০২৬ আগস্ট ০৮ ১১:৫০:১৪

‘মুক্তিযুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ ছিল না’

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেছেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনতার যুদ্ধ, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ এবং মানুষের ভোটাধিকার, মানবিক মর্যাদা ও সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ ছিল না; বরং জনগণের রায়কে অগ্রাহ্য করে গণতন্ত্রকে পদদলিত করার ফলেই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিলেন, তাঁদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরতে চাননি। ফলে স্বাধীনতা যুদ্ধের অসংখ্য ঘটনা, ত্যাগ ও বীরত্বগাঁথা এখনো যথাযথভাবে ইতিহাসে স্থান পায়নি। এসব ঘটনা সাধারণ মানুষের কাছেও অজানা রয়ে গেছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করে জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।

শুক্রবার ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার কোর্সেস ফাউন্ডেশন আয়োজিত বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার কোর্সেস-এর ৫৪তম কমিশনিং ও ফেলোশিপ ডে উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, স্বাধীনতার পর এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে যে, কেবল কয়েকটি ভাষণের মাধ্যমেই দেশ স্বাধীন হয়েছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে অসংখ্য তরুণ, সাধারণ পরিবারের সন্তান এবং সৈনিক জীবন উৎসর্গ করে দেশকে স্বাধীন করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা, সম-অধিকার এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে কীভাবে দেশ স্বাধীন হয়েছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন কী ছিল। তারা যেন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে এবং একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলে।

তিনি আরও বলেন, দেশে আর কোনো স্বৈরশাসনের সৃষ্টি হওয়া উচিত নয়। সরকার ভুল করলে জনগণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তা সংশোধন করবে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা উচিত নয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমই ছিল তাঁদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

তিনি বলেন, শারীরিক যোগ্যতার কারণে অনেককে যুদ্ধের জন্য নেওয়া সম্ভব না হলে তাঁরা কান্নায় ভেঙে পড়তেন এবং দেশের জন্য লড়াই করার সুযোগ চেয়ে নিজ গাড়ির সামনে শুয়ে পড়তেন, যাতে তাঁদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। এসব দৃশ্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অনন্য ও গৌরবময় অধ্যায়।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী জনগণের ভোটের প্রতি কোনো সম্মান দেখায়নি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এ দেশের মানুষ ছয় দফার ভিত্তিতে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে রায় দিলেও সেই গণরায় উপেক্ষা করা হয়।

পরবর্তীতে পাকবাহিনী নিরস্ত্র মানুষের ওপর গণহত্যা চালায় এবং ভয়াবহ নির্যাতন শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে যখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জনগণকে আশ্বস্ত করার বা দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো কার্যকর পরিস্থিতি ছিল না, তখন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের বাঙালি সৈনিক ও কর্মকর্তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন।

১৯৭১ সালের মার্চে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের সদস্যরা যদি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করতেন, তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, দেশের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্যাটালিয়নগুলো প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং সীমিত সংখ্যক সৈনিকের নেতৃত্বে হাজার হাজার ছাত্র-যুবক মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।

তিনি বলেন, প্রায় পাঁচ হাজার সৈনিকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রায় ৮০ হাজার তরুণ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা একসময় প্রায় এক লাখে পৌঁছে যায়। এসব যোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের সৈনিক ও অফিসাররা। তিনি এসব ইতিহাস সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এ সময় তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদান ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করে বলেন, বিশেষ করে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা জাতিকে উদ্দীপ্ত করেছে। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষেও ঘোষণা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা কোনো ব্যক্তিগত কৃতিত্ব অর্জনের জন্য যুদ্ধ করেননি; বরং দেশের অস্তিত্ব, মানুষের জীবন এবং মা-বোনের সম্মান রক্ষার জন্য অস্ত্র হাতে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মনে করেছিল, বাঙালিরা যুদ্ধ করতে পারবে না। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাঙালি সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের সাহস, দক্ষতা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেন।

যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রধান সেনাপতির নির্দেশে তিনি নতুন একটি ব্যাটালিয়ন গঠনের জন্য বিভিন্ন ইয়্যুথ ক্যাম্প থেকে তরুণদের নিয়োগ দেন। সীমান্ত এলাকার ক্যাম্পগুলোতে হাজার হাজার স্কুল-কলেজপড়ুয়া ছাত্র দেশের জন্য যুদ্ধ করতে অপেক্ষা করছিলেন। কঠোর জীবনযাপন, সীমিত খাবার এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সত্ত্বেও তাঁরা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া ও দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গের জন্য উদগ্রীব ছিলেন।

এ সময় তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এ দেশের অকুতোভয় সামরিক ও বেসামরিক মানুষের অবদান ও আত্মত্যাগের ঘটনা সবিস্তারে তুলে ধরেন।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, স্বাধীনতার পর বিদেশে সামরিক প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার সময় তিনি কামালপুরসহ বিভিন্ন যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতার বর্ণনা দিলে বিদেশি সামরিক প্রশিক্ষকেরা বিস্মিত হতেন। তাঁরা মন্তব্য করতেন, এ ধরনের আক্রমণ কোনো পেশাদার বাহিনীর পক্ষেও সম্ভব নয়; কেবল যারা দেশের জন্য জীবন উৎসর্গে প্রস্তুত, তারাই এমন অসাধারণ সাহসিকতা দেখাতে পারে।

স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে দেশের মানুষ যে গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়েছে, সেটিও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। একই সঙ্গে তিনি রাজনীতিকদের আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।

বক্তব্যে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, চারবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধকালে পাকবাহিনীর হাতে বন্দি হয়েছিলেন এবং পাকবাহিনী ঢাকা শহরে তাঁকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে এক আত্মীয়ের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করেছিল। এ সময় তিনি তাঁর স্ত্রী প্রয়াত দিলারা হাফিজের কথাও স্মরণ করেন।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কীভাবে গঠিত হয়েছিল, তার বর্ণনা করে তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ছিল ছোট। কিন্তু দেশের জন্য জীবন উৎসর্গের অদম্য মানসিকতাই ছিল সেই বাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি।

বর্তমান ও আগামী প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মেজর এ মতিন চৌধুরী। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং নৌবাহিনী প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান।

এর আগে সন্ধ্যা ৮টা নাগাদ জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ থেকে পাঠের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির বক্তব্য শেষে সংগঠনের পক্ষ থেকে তাঁকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। এরপর সংগঠনের মহাসচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিরান হামিদুর রহমান উপস্থিত অতিথিদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

ফের দেশের বাজারে বাড়ল স্বর্ণের দাম

ফের দেশের বাজারে বাড়ল স্বর্ণের দাম

নিজস্ব প্রতিবেদক: একদিনের ব্যবধানেই দেশের বাজারে আবারও বেড়েছে স্বর্ণের দাম। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম ভরিতে ৪... বিস্তারিত