ঢাকা, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ক্রেতা সংকটে ময়মনসিংহের সর্ববৃহৎ চামড়ার হাটে ধস

২০২৬ মে ৩০ ১৩:৩৪:৫৬

ক্রেতা সংকটে ময়মনসিংহের সর্ববৃহৎ চামড়ার হাটে ধস

নিজস্ব প্রতিবেদক: বৃহত্তর ময়মনসিংহ ভূখণ্ডের সর্ববৃহৎ চামড়ার আড়ত হিসেবে খ্যাত শহরতলির শম্ভুগঞ্জ বাজারে আজ শনিবার (৩০ মে) সাপ্তাহিক হাট বসার কথা ছিল। তবে হাটে বিপুল পরিমাণ চামড়ার আমদানি থাকলেও ট্যানারি মালিক ও বড় পাইকারদের অনুপস্থিতির কারণে বেচাকেনা স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে চামড়া নিয়ে আসা ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা চরম হতাশা আর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।

আজ শনিবার সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত শম্ভুগঞ্জ চামড়ার হাট ঘুরে এমন থমথমে চিত্রই চোখে পড়েছে। পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে এই হাটে শুধু ময়মনসিংহ বিভাগই নয়, বরং নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ এবং কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা চামড়া বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে আসেন। মূলত রাজধানী ঢাকার ট্যানারি মালিক ও তাদের প্রতিনিধিরা এখান থেকে চামড়া সংগ্রহ করে থাকেন। এখানে প্রতি শনিবার নিয়মিত হাট বসার পাশাপাশি ঈদ পরবর্তী সময়ে মঙ্গলবারও বিশেষ হাটের ব্যবস্থা করা হয়।

উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কোরবানির পশুর লবণযুক্ত চামড়ার ন্যূনতম বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক, ঢাকার অভ্যন্তরে গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা ধার্য করা হয়েছে।

হালুয়াঘাট থেকে ৪৬ পিস গরুর চামড়া নিয়ে শম্ভুগঞ্জ হাটে এসেছিলেন ব্যবসায়ী রামলাল রবি দাস। কিন্তু বাজারে কোনো পাইকার বা ট্যানারির প্রতিনিধি না পেয়ে চামড়াগুলো স্তূপ করে কাগজ দিয়ে ঢেকে রেখে স্থান ত্যাগ করছিলেন তিনি। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আজ বড় হাট বসার কথা ছিল, কিন্তু একজন ব্যাপারীরও দেখা নাই। মাল বিক্রি করতে পারছি না। ক্রেতা থাকলে তো বেচতাম। চামড়া নিয়ে আমরা এখন চরম বিপাকে আছি। প্রতিটি কাঁচা চামড়া ৭০০ টাকা পর্যন্ত কিনে, তাতে আরও ২০০ টাকার লবণ ও ১০০ টাকার শ্রমিক খরচ করতে হয়েছে। এখন বাজারে কেনার মানুষ নেই। গত দুই-তিন বছর ধরে শুধু লোকসান গুনছি। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া আর পথ থাকবে না।”

একই সুর শোনা গেল আরেক মৌসুমী ব্যবসায়ী সুধর রবিন দাসের কণ্ঠে। তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, “মাল নিয়ে বাজারে এসেছি, অথচ এখন পর্যন্ত কোনো ক্রেতার দেখা মিলল না। চামড়াগুলো এক জায়গায় স্তূপ করে রেখে বাড়ি চলে যাচ্ছি, দেখি আগামী হাটে কী কপালে আছে।”

দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক ধরে চামড়া ব্যবসার সঙ্গে জড়িত স্থানীয় পাইকার মো. আবদুল কাদির বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, “সরকার দাম বেঁধে দিলেও আমরা মাঠপর্যায়ে সেই মূল্য পাই না। দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে এই পেশায় আছি। প্রতি বছর লোকসান দিতে দিতে এখন মূলধন শেষ হয়ে পথে বসার দশা হয়েছে। ট্যানারি মালিকরা যদি আমাদের ন্যায্য মূল্য দেন, তবেই হয়তো আসল টাকা নিয়ে ঘরে ফিরতে পারব। অন্যথায় আমাদের কপালে শুধু ধ্বংসই নাচছে।”

হাটে ট্যানারি মালিক ও বড় ক্রেতাদের সমাগম না হওয়ায় বাজার জমেনি বলে স্বীকার করেছেন হাটের ইজারাদারের প্রতিনিধি মো. মোস্তফা কামাল। তিনি বলেন, “আমরা সব ট্যানারি মালিকদের এই হাটে এসে চামড়া কেনার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছি, যেন প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা সঠিক মূল্য পান। এই বিষয়ে আমরা সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি। কারণ ট্যানারিগুলো এক ধরনের সিন্ডিকেট তৈরি করে চামড়ার দাম একদম কমিয়ে দেয়। যার ফলে গত বছরও ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। আমরা আশা করছি, এবার সরকার নির্ধারিত দাম মেনেই ট্যানারি মালিকরা চামড়া কিনবেন।”

স্থানীয় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের দাবি, কাগজে-কলমে সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা থাকলেও ট্যানারিগুলোর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের কারণে বাজারে কখনোই কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যায় না। এর ফলে বছরের পর বছর লোকসানের বোঝা টানতে হচ্ছে প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের। এই সংকটময় অবস্থা থেকে উত্তরণে দ্রুত কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

এমজে/

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত