ঢাকা, বুধবার, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১ মাঘ ১৪৩২

৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে ঢাকা

২০২৬ জানুয়ারি ১৪ ১৮:৩৩:১৮

৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে ঢাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভূমিকম্প থামানো মানুষের হাতে না থাকলেও বাংলাদেশে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মারাত্মক মানবিক বিপর্যয়ে রূপ দিচ্ছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক প্রস্তুতি ও শাসনব্যবস্থা না থাকায় একটি বড় ভূমিকম্প দেশের জন্য ‘মেগা ডিজাস্টার’-এ পরিণত হতে পারে।

তারা সতর্ক করে বলেন, রাজধানী ঢাকায় যদি ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে, তাহলে ১০ লাখেরও বেশি ভবন ধসে পড়তে পারে এবং প্রাণ হারাতে পারেন নগরীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি যে অত্যন্ত দুর্বল—তা নিয়েই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন আলোচকরা।

বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে ‘ভূমিকম্পে জীবন ও সম্পদ রক্ষায় করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়। এসোসিয়েশন অব ডেভেলপমেন্ট এজেন্সিজ ইন বাংলাদেশ (এডাব) এবং বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজন করে।

এডাবের চেয়ারপারসন আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে এবং পরিচালক একেএম জসীম উদ্দিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন ক্যাপসের সভাপতি অধ্যাপক ড. আহমাদ কামরুজ্জামান মজুমদার। ভূমিকম্পের কারিগরি ও উদ্ধার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে মাল্টিমিডিয়া উপস্থাপনা দেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক পরিচালক (অপারেশন) মেজর (অব.) শাকিল নেওয়াজ।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের মধ্যে অবস্থান করছে। ভূমিকম্প একটি স্বাভাবিক ভূ-প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, এটি অনিবার্য। কিন্তু সময়মতো প্রস্তুতি না থাকায় তুলনামূলক কম ঝুঁকির দেশ হয়েও বাংলাদেশ বড় ধরনের ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে।

তাদের মতে, বিল্ডিং কোড অমান্য করে বহুতল ভবন নির্মাণ, নরম পলিমাটিতে ভারী স্থাপনা, অতিরিক্ত গ্লাস বিল্ডিং, মাত্রাতিরিক্ত জনঘনত্ব, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া, ভবনে বিকল্প বের হওয়ার পথ না থাকা এবং সর্বস্তরে দুর্নীতি—এসবই ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা ও কুসংস্কার।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, বড় মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকার হাসপাতালগুলো নিজেরাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, রাস্তাঘাটে ফাটল সৃষ্টি হবে এবং অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়বে। এমন পরিস্থিতিতে উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠবে।

এই বাস্তবতায় বক্তারা বলেন, ভূমিকম্প মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সচেতনতা, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং আগাম প্রস্তুতি। ব্যক্তি ও পরিবার থেকে শুরু করে কমিউনিটি, স্থানীয় সরকার এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা ছাড়া বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব নয়।

ভূমিকম্প প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে সংস্কার, সিভিল ডিফেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়ানো, কমিউনিটি ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন, স্থানীয় সরকার ও পৌর কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ভবন নির্মাণ বিধিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানান বক্তারা।

এছাড়া স্কুল-কলেজ ও পাড়া-মহল্লায় ভূমিকম্প বিষয়ক মহড়া, মিডিয়া ও এনজিওদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, হাসপাতালের মানসিক ও সামাজিক সহায়তা প্রস্তুতি, পানি ও সড়ক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং জিওলজিক্যাল সার্ভে বিভাগকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে। কুসংস্কার দূর করতে বিজ্ঞানভিত্তিক জনসচেতনতা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন তারা।

বক্তারা বলেন, ভূমিকম্প প্রাকৃতিক হলেও প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ মূলত মানুষের তৈরি। এসব ঝুঁকি কমাতে রাজনৈতিক অঙ্গীকার অপরিহার্য। জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস—এই উপলব্ধি থেকে নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্মিলিত চাপ ও ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।

সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন অধ্যাপক ড. শহীদুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান, ওয়াহিদা বানু, গওহর নাঈম ওয়ারা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান।

এমজে/

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

জাতীয় এর অন্যান্য সংবাদ