ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭ পৌষ ১৪৩২

ফার্মগেট মেট্রোরেল দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানাল তদন্ত কমিটি

২০২৬ জানুয়ারি ০১ ১৬:৫৯:২৭

ফার্মগেট মেট্রোরেল দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানাল তদন্ত কমিটি

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর ফার্মগেটে মেট্রোরেল অবকাঠামোর ত্রুটিজনিত এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পেছনের কারণ চিহ্নিত করেছে সেতু বিভাগের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি। গত ২৬ অক্টোবর মেট্রোরেলের একটি পিলারের বিয়ারিং প্যাড বিচ্যুত হয়ে নিচে পড়ে শরীয়তপুরের আবুল কালাম (৩৫) নামের এক পথচারীর মৃত্যু হয়। ঘটনার পরপরই গঠিত তদন্ত কমিটি মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন, সাক্ষাৎকার ও কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিরূপণ করেছে।

দুর্ঘটনার পর সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে ছিলেন বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এ বি এম তৌফিক হাসান, এমআইএসটির সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জাহিদুল ইসলাম, ডিএমটিসিএল লাইন-৫ প্রকল্পের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব এবং সদস্য সচিব উপসচিব আসফিযা সুলতানা। পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এছাড়া তদন্ত কার্যক্রম জোরদার করতে কমিটিতে যুক্ত হন দুইজন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. খান মাহমুদ আমানত ও ড. রাকিব আহসান এবং ফরেনসিক প্রতিনিধি হিসেবে সিআইডির এসএসপি মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।

দায়িত্ব গ্রহণের পর কমিটি দুর্ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করে। প্রত্যক্ষদর্শী, ট্রেন চালক, অপারেটর, মেট্রোরেল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, বিয়ারিং প্যাড প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদার এবং ডিজাইন কনসালট্যান্টদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ডিজাইন ডকুমেন্ট, প্রযুক্তিগত প্রতিবেদন ও অন্যান্য উপাত্ত বিশদভাবে যাচাই করা হয়। ট্রেন চলাচলের সময় কম্পন পরিমাপসহ বিভিন্ন ল্যাবরেটরি পরীক্ষা পরিচালনা করা হয়।

তদন্তে দেখা গেছে, দুর্ঘটনায় পতিত বিয়ারিং প্যাডের হার্ডনেস, কম্প্রেশন সেট ও নিওপ্রিন কন্টেন্ট প্রচলিত মানদণ্ড অনুযায়ী ছিল না। পাশাপাশি বিয়ারিং প্যাডগুলো ০.৮ শতাংশ ঢালু অবস্থায় বসানো হয়েছিল, যা বিচ্যুতির ঝুঁকি বাড়িয়েছে। ফার্মগেট স্টেশনের দুই প্রান্তে বৃত্তাকার এলাইনমেন্ট থাকলেও কার্ভ এলাইনমেন্টের জন্য আলাদা মডেলিং ও বিশ্লেষণ করা হয়নি। এর ফলে অপ্রয়োজনীয় পার্শ্ববল ও অতিরিক্ত কম্পনের সৃষ্টি হয়। মধ্যবর্তী স্থানে রিজিড ট্র্যাক ব্যবহারের কারণেও ভাইব্রেশন বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কমিটি মোট দশটি বৈঠকের মাধ্যমে তথ্য বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এ সময় ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরের আগের একটি দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনও পর্যালোচনা করা হয়। প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়, আগের তদন্তে উল্লিখিত কোনো কারণই নিশ্চিতভাবে নির্ধারিত হয়নি। এছাড়া বর্তমান দুর্ঘটনার সঙ্গে কোনো ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।

দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে তদন্ত কমিটি মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিয়ারিং প্যাড স্থিতিশীল রাখতে যথাযথ কারিগরি ব্যবস্থা গ্রহণ, থার্ড পার্টি ইন্ডিপেন্ডেন্ট কনসালট্যান্ট দিয়ে ভায়াডাক্টের স্ট্রাকচারাল ও ট্র্যাক ডিজাইন পর্যালোচনা, পুরো মেট্রোরেল প্রকল্পে থার্ড পার্টি সেফটি অডিট পরিচালনা, দ্রুত কার্যকর স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং সিস্টেম স্থাপন এবং স্থানীয় বিশেষজ্ঞ ও বিদেশি পরামর্শকের মাধ্যমে প্রযুক্তি স্থানান্তরসহ কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বৃদ্ধি।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত