ঢাকা, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ভারতে পলাতক নানকের কাছে মাসে যায় কোটি টাকা, নেপথ্যে কারা?
নিজস্ব প্রতিবেদক: পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের কাছে বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত হুন্ডির মাধ্যমে টাকা যাচ্ছে-এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। বরিশাল ও ঢাকার বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়ি ও সম্পত্তি থেকে আসা আয়ের একটি অংশ দুই হুন্ডি ব্যবসায়ী এবং বেনাপোলের একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে পৌঁছাচ্ছে বলে জানা গেছে। ওই অর্থ ভারতে পৌঁছে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে রয়েছেন নানকের তিন ঘনিষ্ঠজন।
কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার ডিজিটাল মাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে যাওয়ার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছিলেন নানক। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট পর্যন্ত তিনি দেশেই ছিলেন। ওই দিন তামাবিল সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে শিলংয়ে যান তিনি। পরে মালদা হয়ে কলকাতায় চলে যান। তাঁর পালিয়ে যাওয়ার পুরো পরিকল্পনা করেন মেয়ে রাখির স্বামী ডা. নাজমুল। তবে ওই সাক্ষাৎকারে নানক যা বলেননি, তা হলো কলকাতার অভিজাত তপসিয়া এলাকায় আগে থেকেই একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ভাড়া করা ছিল। কলকাতায় যাওয়ার পর স্ত্রীকে নিয়ে সেখানেই ওঠেন তিনি।
বর্তমানে এই দম্পতিকে মাঝেমধ্যে কলকাতার নামীদামি শপিংমলে দেখা যায়। দেশের মতো বিদেশে পালিয়ে থাকা অবস্থাতেও দামি গাড়িতে চড়া ও বিলাসী জীবনযাপনের সবকিছুই তাঁরা ভোগ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর জোগান বাংলাদেশ থেকে যায় বলেও জানা গেছে। প্রতি মাসে বরিশাল ও ঢাকা থেকে নানকের কাছে অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা পাঠানো হয় বলে অভিযোগ।
সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর নানকের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করা এক ব্যক্তি পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করেন বলে জানা গেছে। ৫ আগস্টের পর অবশ্য আন্দোলনের মুখে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছাড়তে হয়। এরপরও নানকের ক্ষমতার সময়ে তাঁর কাছ থেকে নানা সুবিধা নেওয়া ষাটোর্ধ্ব এই ব্যক্তি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বরিশাল নগরীর সদর রোড ও কাঠপট্টি এলাকার দুই হুন্ডি ব্যবসায়ীর মাধ্যমে সরাসরি ভারতে নানকের কাছে টাকা যায় বলে জানা গেছে। তাঁদের একজন হোটেল ব্যবসায়ী। অন্যজন স্বর্ণ ব্যবসার আড়ালে অবৈধ হুন্ডির ব্যবসা পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ। এখানে থাকা বিশাল ভবনসহ অন্যান্য ছোট-বড় বাড়ির ভাড়া তুলে সরাসরি ওই দুই হুন্ডি ব্যবসায়ীর কাছে দেওয়া হয়। পরে তাঁরাই পশ্চিমবঙ্গে রুপিতে নানকের কাছে সেই অর্থ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন বলে জানা গেছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের একটি বড় অংশও দাপ্তরিক ফাঁক গলে ভারতে চলে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। ঢাকায় থাকা তিনটি বাড়িসহ অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে আসা আয়ও একইভাবে সেখানে পাঠানো হয়। এ ক্ষেত্রে বেনাপোল সীমান্তে থাকা একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের মালিককে ব্যবহার করা হয় বলে জানা গেছে। ওই মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীর যশোরে থাকা ব্যাংক হিসাবে ঢাকা থেকে টাকা পাঠানো হয়। এরপর তিনি তাঁর পশ্চিমবঙ্গের এজেন্টের মাধ্যমে নানকের কাছে রুপি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন। ঢাকার আয় পশ্চিমবঙ্গে পাঠানোর বিষয়টি দেখভাল করেন নানকের এক ছোট ভাই বলে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগ শাসনামলের ১৭ বছরে অর্থবিত্তে ফুলেফেঁপে ওঠেন বরিশাল নগরীর বটতলা এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর কবির নানক। যদিও তিনি এমপি হয়েছিলেন ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামায় নিজের ও স্ত্রীর মিলিয়ে মাত্র ৬৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার সম্পদ থাকার তথ্য দিয়েছিলেন নানক। ১৬ বছরের ব্যবধানে ২০২৪ সালের নির্বাচনের হলফনামায় তিনি দুজনের সম্পদের পরিমাণ দেখান ১৯ কোটি টাকা। দুই হলফনামার হিসাব অনুযায়ী সম্পদ ৩০ গুণ বাড়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে নানক পরিবারের সম্পদ এর চেয়ে বহুগুণ বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব সম্পদের মূল্য শত কোটি টাকার বেশি বলেও দাবি করা হয়েছে।
বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ এলাকায় নানক দম্পতির মালিকানাধীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘গ্লোবাল ভিলেজ’-এর কথা দাখিল করা ওই হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাবও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বরিশালের প্রবেশদ্বার দোয়ারিকা সেতু এলাকায় থাকা আট একর জমির কথাও কোথাও উল্লেখ করেননি নানক। বরিশাল নগরীতে দুটি বাড়ি ও মাছের খামারসহ দুই একর ২২ শতাংশ ভূ-সম্পত্তির কথা হলফনামায় থাকলেও এসব সম্পত্তির অধিকাংশে থাকা ছোট-বড় ভবনের কথা যেমন উল্লেখ নেই, তেমনি এসব ভবন থেকে আসা ভাড়ার কথাও হলফনামা তথা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে জানাননি এই আওয়ামী লীগ নেতা। এর বাইরে ঢাকার কলাবাগান এলাকায় বহুতল ভবনসহ কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ রয়েছে নানকের বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের নির্বাচনে দেওয়া হলফনামায় বরিশালে দুটি বাড়ি ছাড়াও রাজধানীর উত্তরায় একটি ছয়তলা এবং মোহাম্মদপুরে একটি আটতলা বাড়ি থাকার তথ্য দিয়েছিলেন নানক। তাঁর এসব সম্পদে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কোনো ক্ষতি হয়নি বলে জানা গেছে। বিশেষ করে বরিশাল নগরীর বটতলা এলাকায় থাকা বাড়িতে কেউ একটি ঢিলও ছোড়েনি। ফলে এসব ভবন যেমন বহাল তবিয়তে রয়েছে, তেমনি ভাড়া বাবদ নিয়মিত লাখ লাখ টাকা আদায় হচ্ছে। একইভাবে মসৃণ গতিতে চলা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও প্রতি মাসে বিপুল অর্থ আয় হচ্ছে। এর পাশাপাশি বরিশাল নগরীর রুপাতলী, মতাসার, সার্কুলার রোড ও করিম কুটিরসহ বিভিন্ন এলাকায় নানকের জমিতে থাকা ছোট-বড় বাসাবাড়ি থেকেও ভাড়া বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা উঠছে। সব মিলিয়ে এই টাকার পরিমাণ প্রতি মাসে এক কোটিরও বেশি বলে অভিযোগ। আর এই পুরো টাকাই হুন্ডির মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে থাকা নানকের কাছে চলে যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গ থেকে দেশে ফেরা আওয়ামী লীগের এক কর্মী যুগান্তরকে বলেন, ‘হুন্ডির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া টাকা আনতে বাড়ির বাইরে যেতে হয় না নানককে। নির্ধারিত এজেন্টরা তপসিয়া এলাকার ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসেন তা। ৫ আগস্টের পর টানা প্রায় ২ বছর এভাবেই দেখেছি। ওই টাকা দিয়ে রাজকীয় হালে পশ্চিমবঙ্গে দিন কাটাচ্ছেন তিনি।’
এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের পরিচিত সবগুলো ফোন ও মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর দেননি তিনি।
ইমামুল
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- ঢাবি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের ১১তম মাসিক সভা অনুষ্ঠিত
- ১১-২০ গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষায় নতুন মানবণ্টন
- ঢাবির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সিরাজুল হক আর নেই
- নব্বইয়ের দশকের রেট্রো ছবি বানাবেন যেভাবে, জেনে নিন ১০ AI প্রম্পট
- পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ নিয়ে সুখবর দিল মন্ত্রণালয়
- ‘সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন বিলটি কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক’
- ফেল বিরোধীদলের ওয়াকআউট
- ব্যালন ডি’অর ২০২৬-এর ৩০ ফুটবলারের তালিকা প্রকাশ
- মেঘনা গ্রুপে বিভিন্ন পদে চাকরির সুযোগ
- বক্তৃতায় দায় সারছে কমিশন, ধসের মুখে পড়েছে বাজার
- সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা ডিজিটাল ঋণ চালু করল বাংলাদেশ ব্যাংক
- বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানের ভাইভার তারিখ প্রকাশ
- ১১-২০ গ্রেডের চাকরিতে ভাইভার নম্বর বাড়ছে
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (৭ সেপ্টেম্বর)
- নতুন পে-স্কেলে মোবাইল ভাতা পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা, কোন গ্রেডে কত?