×

ঢাকা, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩

রাশিয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও পারমাণবিক সহযোগিতায় এগোচ্ছে বাংলাদেশ

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৯ ১০:৫১:১৫

রাশিয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও পারমাণবিক সহযোগিতায় এগোচ্ছে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পারমাণবিক কর্মসূচিতে প্রধান সহযোগী হিসেবে রয়েছে রাশিয়া। পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, বিপুল ঋণ এবং বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও কর্মীদের প্রশিক্ষণ সব ক্ষেত্রেই মস্কোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। চিকিৎসা ও অন্যান্য খাতেও পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে রাশিয়ার সহযোগিতা নিচ্ছে বাংলাদেশ। তবে দীর্ঘদিনের এই একমুখী নির্ভরতায় এখন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। রাশিয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও পারমাণবিক সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণে আগ্রহ দেখাচ্ছে ঢাকা।

রূপপুরে নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে একই সক্ষমতার আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণেও আগ্রহ দেখিয়েছে রাশিয়া। এরই মধ্যে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক বৈঠক ও চুক্তিগুলোতে বাংলাদেশের পারমাণবিক সহযোগিতার পরিধিতে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে যুক্ত করার উদ্যোগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

রূপপুর প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। এর ৯০ শতাংশই রাশিয়ার ঋণ, যা বাংলাদেশকে ২৮ বছরে পরিশোধ করতে হবে। প্রকল্প পরিচালনার জন্য এ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও কর্মী রুশ সহায়তায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। আগামী বছর প্রকল্পটির প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল মস্কোতে। সেখানে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রকে দুই দেশের সম্পর্কের ‘অনন্য প্রতীক’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। একই মাসে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠকে ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর) ও ভাসমান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।

এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার জন্য একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত এমওইউতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং এ জন্য পারমাণবিক জ্বালানি ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি রাখা হয়েছে। পাশাপাশি গবেষণা, চিকিৎসা, কৃষি ও অন্যান্য খাতে পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের সুযোগও এতে রাখা হয়েছে। এমওইউ স্বাক্ষরের পর এর মেয়াদ থাকবে পাঁচ বছর। পরে এটি বাতিল কিংবা নবায়নের সুযোগ থাকবে।

তবে কর্মকর্তারা বলছেন, এটি একেবারে নতুন কোনো উদ্যোগ নয়। ১৯৮১ সালে সই হওয়া এবং ১৯৯১ সালে সর্বশেষ নবায়ন করা বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। সেই কারণে নতুন একটি আইনি কাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে।

আগস্টের শুরুতে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সার্জিও গোরের তিন দিনের ঢাকা সফরে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে এই এমওইউ সইয়ের প্রস্তাব দেয় ওয়াশিংটন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকেও বিষয়টি আলোচনায় আসে।

গত ৯ আগস্ট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এমওইউর খসড়া নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে খসড়াটি আরও পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এর তিন সপ্তাহ পর, আগস্টের শেষে ওয়াশিংটনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট। বৈঠকে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল এসএমআর প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও জ্ঞানবিনিময়।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী জানান, ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা মেটাতে এসএমআরের সম্ভাবনাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে ঢাকা। অন্যদিকে, পরবর্তী প্রজন্মের পারমাণবিক প্রযুক্তি উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি।

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে ফেব্রুয়ারিতে সই হওয়া বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে, যার বিনিময়ে পাল্টা শুল্ক ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়, একটি শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। ওই শর্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা কৌশলগত স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কেনা যাবে না।

অবশ্য বর্তমানে নির্মাণাধীন রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রকে এই চুক্তির শর্তের বাইরে রাখা হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রে ওই শর্ত কার্যকর হবে। ফলে রুশ সহায়তায় নির্মিত রূপপুর প্রকল্পের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ কিংবা জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।

রূপপুরে বিনিয়োগ, ঋণ ও প্রশিক্ষণের বিশাল কাঠামো এখনো রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ককে শক্তভাবে ধরে রেখেছে। মস্কোর সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা আরও গভীর করার প্রতিশ্রুতিও অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ এবং এসএমআর প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহকে বাংলাদেশের জ্বালানি-বৈচিত্র্যকরণ কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।

তবে বাণিজ্য চুক্তির শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট বার্তা রয়েছে ভবিষ্যতে পারমাণবিক প্রযুক্তির উৎস বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ওয়াশিংটনের কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনায় রাখতে হবে। তাই এখনই ‘রাশিয়া ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝোঁকা’ হিসেবে বিষয়টিকে দেখা অতিসরলীকরণ হলেও, দীর্ঘমেয়াদে রূপপুর-পরবর্তী পারমাণবিক অধ্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থান কোন দিকে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেন, ‘পারমাণবিক শক্তি শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে রাশিয়া, ফ্রান্সসহ আরও পাঁচটি দেশের সঙ্গে রয়েছে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি। ১৯৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ গবেষণা চুল্লি এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আগের চুক্তি যুগোপযোগী করলে দেশের পারমাণবিক অবকাঠামো আরও শক্তিশালী হবে। বহু দেশের সঙ্গে চুক্তি করা থাকলে একক দেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে। তবে এক্ষেত্রে সবসময় নিজ দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে আমাদের।’

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত