×

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩

নাগরিকত্বের জন্য ‘চুক্তিভিত্তিক বিয়ে’ কি শরিয়তসম্মত?

২০২৬ আগস্ট ৩১ ১৯:৩৩:০৭

নাগরিকত্বের জন্য ‘চুক্তিভিত্তিক বিয়ে’ কি শরিয়তসম্মত?

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিয়ে মানুষের জীবনের একটি পবিত্র ও সামাজিক বন্ধন। ইসলামে বিবাহকে কেবল আবেগ বা প্রয়োজনের বিষয় হিসেবে দেখা হয়নি; বরং একে স্থায়ী ইবাদত ও দায়িত্বশীল চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উন্নত দেশের নাগরিকত্ব বা ভিসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে ‘চুক্তিভিত্তিক বিয়ে’ বা কাগজ-কলমের বিয়ের প্রচলন দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের বিয়ে ইসলামি দৃষ্টিতে কতটা শরিয়তসম্মত এবং এভাবে আকদ সম্পন্ন করলে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী বিবাহ সংঘটিত হয় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ইসলামে ধোঁকা ও প্রতারণার কঠোর নিষেধাজ্ঞা

নাগরিকত্ব বা ভিসার সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে কোনো ধরনের বাস্তব সম্পর্ক ছাড়া চুক্তিভিত্তিক বিয়ে করা মূলত জালিয়াতি ও অসত্যের আশ্রয় নেওয়ার শামিল। ইসলামে কোনো অবস্থাতেই ধোঁকা ও প্রতারণা বৈধ নয়। একজন প্রকৃত মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য সত্যবাদিতা ও আমানতদারি। কোরআন মজিদে মিথ্যা ও অসত্য থেকে বিরত থাকার বিষয়ে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—

فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ

‘সুতরাং তোমরা মূর্তিপূজার অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকো এবং পরিহার করো মিথ্যা কথা।’ (সুরা আল-হজ: আয়াত ৩০)

প্রতারণামূলক আচরণে লিপ্ত ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ থেকে বিচ্যুত। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে—

مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا

‘যে ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে ধোঁকাবাজি বা প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (মুসলিম ১০২)

এ ছাড়া লোকদেখানো বা প্রতারণামূলক আচরণ মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। এ বিষয়ে আল্লাহর রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন—

آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلاَثٌ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ

‘মুনাফিকের আলামত তিনটি—কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা খেলাফ করে এবং আমানত রাখা হলে তাতে খেয়ানত করে।’ (বুখারি ৩৩)

শরিয়তসম্মত আকদ হলে কী হবে?

উদ্দেশ্য যা-ই হোক, শরিয়তের নির্ধারিত নিয়ম মেনে আকদ করা হলে ইসলামি আইনে তার প্রভাব পড়ে। বিয়ের নিয়ম অনুযায়ী দুজন যোগ্য সাক্ষীর উপস্থিতিতে প্রস্তাব (ইজাব) ও সম্মতি (কবুল) সম্পন্ন হলে বিবাহ সংঘটিত হয়ে যায়—তা আন্তরিকভাবে করা হোক কিংবা কোনো সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্যে করা হোক।

কারণ বিয়ে ও তালাকের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে রসিকতা বা অভিনয়ের সুযোগ নেই। হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

ثَلاَثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ: النِّكَاحُ، وَالطَّلاَقُ، وَالرَّجْعَةُ

‘তিনটি বিষয় এমন, যা গাম্ভীর্যের সঙ্গে করলেও তা কার্যকরী হয় এবং ঠাট্টা-ছলে করলেও তা ধর্তব্য ও কার্যকর হয়; বিষয়গুলো হলো—বিবাহ, তালাক এবং তালাকে রাজঈর পর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া।’ (তিরমিজি ১১৮৪, আবু দাউদ ২১৯৪)

অতএব, দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে শরিয়তসম্মত ইজাব-কবুল হলে শরিয়তের বিচারে তারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে গণ্য হবেন। পরবর্তী সময়ে তারা আলাদা হতে চাইলে ইসলামি শরিয়তের নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে তালাক বা খোলার মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ করতে হবে। বিচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রী অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবেন না; করলে তা বাতেল বলে গণ্য হবে।

তবে শরিয়তসম্মত ইজাব-কবুল ছাড়া যদি কেবল কাগজপত্রে বা রেজিস্ট্রি নথিতে স্বাক্ষর করা হয় এবং সাক্ষীদের সামনে শরিয়তের আকদ সম্পাদিত না হয়, তাহলে ইসলামে তা বিবাহ হিসেবে গণ্য হবে না। ফলে ইসলামি দৃষ্টিতে কোনো বৈবাহিক সম্পর্কও তৈরি হবে না এবং বিচ্ছেদের জন্য পৃথক তালাকেরও প্রয়োজন হবে না।

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত