ঢাকা, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩

নতুন রাষ্ট্রপতি বাছাইয়ে কেমন প্রার্থী খুঁজছে বিএনপি?

২০২৬ জুলাই ৩১ ১৬:০৬:১৮

নতুন রাষ্ট্রপতি বাছাইয়ে কেমন প্রার্থী খুঁজছে বিএনপি?

নিজস্ব প্রতিবেদক: মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তীব্র হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম নিয়ে নানা জল্পনা চললেও বিএনপি এবার অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনটি বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দলটির মতে, দল ও দেশের প্রতি আস্থা, দক্ষতা-প্রজ্ঞা এবং সংকট মোকাবিলায় সাহস-এই তিন গুণসম্পন্ন সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিকেই রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হবে।

দলীয় সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের সাংগঠনিক এখতিয়ার বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে থাকলেও প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সঙ্গে আলোচনা করা হতে পারে।

সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত দলীয় ফোরামে আলোচনা করেই গ্রহণ করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ধারাকে সমুন্নত রেখে দেশের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্বে দেখতে চায় দল।

একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, ‘সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, শ্রদ্ধেয়, দক্ষ, বিজ্ঞ এবং দেশের প্রতি আনুগত্যসম্পন্ন একজন ব্যক্তিকেই রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপি মনোনয়ন দেবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গত ১৮ বছর স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়লাভ করেছেন। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপর দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীর আস্থা রয়েছে। সবদিক বিবেচনা করেই তিনি যথাযথ সিদ্ধান্ত নেবেন।’

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন। জানা গেছে, আগামী সেপ্টেম্বরের সংসদ অধিবেশনেই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দলীয় নেতাদের মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে শুধু দলীয় আনুগত্য নয়, ব্যক্তির দক্ষতা ও বিচক্ষণতাও সমানভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। অতীতের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে বিএনপির অভ্যন্তরে আলোচনা হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি বাছাইয়ে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-দেশ ও দলের প্রতি আস্থা, দক্ষতা ও প্রজ্ঞা এবং সংকটকালে সাহসিকতার পরিচয় দেওয়ার সক্ষমতা।

উদাহরণ হিসেবে ১৯৯৬ সালের মে মাসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হচ্ছে। বিএনপির নেতাদের মতে, তার সাহসী অবস্থানের কারণেই সে সময় তৎকালীন সেনাপ্রধান লে. জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল।

অন্যদিকে, ২০০৬ সালে রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকারী অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য থাকলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে অদক্ষতার অভিযোগ রয়েছে। এর ফলেই এক-এগারোর জরুরি সরকারের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে বিএনপির অভ্যন্তরে আলোচনা রয়েছে।

একইভাবে বিএনপির মনোনীত রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ক্ষেত্রেও দলীয় আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠার বিষয়টি বিএনপির নেতারা স্মরণ করছেন। তাদের মতে, রাষ্ট্রপতি পদে ভুল সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে দলকে বড় ধরনের মূল্য দিতে বাধ্য করতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অতীতের রাষ্ট্রপতিদের সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার একজন সৎ, মর্যাদাসম্পন্ন, সর্বজনগ্রাহ্য ও যোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি করা প্রয়োজন। তার মতে, রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান নাগরিক হওয়ায় এ পদে ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা ও নৈতিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরীও মনে করেন, কেবল দলীয় বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সমীচীন নয়। তার ভাষায়, সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত হলেও জাতীয় সংকটের সময়ে রাষ্ট্রপ্রধানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এমন একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি করা উচিত, যার ওপর সর্বস্তরের মানুষের আস্থা থাকবে এবং যিনি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি অন্ধভাবে বাধ্য থাকবেন না।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘যিনি সত্যিকার অর্থে দেশের অভিভাবক হতে পারবেন, তাকেই রাষ্ট্রপতি করা উচিত।’ তার মতে, জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

স্বাধীনতার ৫৫ বছরে দেশে ২২ জন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করেছেন। এদের মধ্যে একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বিতর্কের মুখে পদত্যাগ করেন এবং গণ-অভ্যুত্থানে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতন ঘটে। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ সর্বদলীয় গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করলেও আওয়ামী লীগের দৃষ্টিতে তিনি ‘বিশ্বাসঘাতক’ ছিলেন। অন্যদিকে সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা রয়েছে।

এসব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে চায় বিএনপি। দলটির লক্ষ্য, বিতর্ক এড়িয়ে এমন একজন সর্বজনগ্রাহ্য, দক্ষ ও সাহসী ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া, যিনি রাজনৈতিক সংকটের সময়ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

দেশের বাজারে ফের বেড়েছে সোনার দাম

দেশের বাজারে ফের বেড়েছে সোনার দাম

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বাজারে আবারও বেড়েছে সোনার গহনার দাম। স্থানীয় বাজারে তেজাবী (পিওর) সোনার মূল্য বৃদ্ধির কারণে ২২ ক্যারেট সোনার... বিস্তারিত