ঢাকা, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: শেষ মুহূর্তে বদলাতে পারে সমীকরণ
নিজস্ব প্রতিবেদক: মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন-এ প্রশ্ন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপির ভেতরে ও বাইরে একাধিক নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ মুহূর্তে সমীকরণ বদলে যেতে পারে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য, অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে দক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও আস্থাভাজন একজন ব্যক্তিকেই রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিতে চায় বিএনপি। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর।
বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয় আনুগত্যের পাশাপাশি দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সাহস এবং সর্বজনগ্রাহ্যতা-এই চারটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করতে চায় না দলটি। সব দিক বিবেচনা করে এবং প্রয়োজনীয় সময় নিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে তারা।
রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের এখতিয়ার বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর থাকলেও প্রয়োজন হলে তিনি দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও এ বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত দলীয় ফোরামে আলোচনা করেই গ্রহণ করা হবে।’
জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ধারাকে সমুন্নত রেখেই আমরা দেশের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্বে দেখতে চাই।’
বুধবার প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও একই ধরনের মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপি বেছে নেবে; যিনি একই সঙ্গে হবেন দক্ষ, বিজ্ঞ এবং দেশের প্রতি যার আনুগত্য রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গত ১৮ বছর স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়লাভ করেছেন। সুতরাং তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপরে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীর আস্থা রয়েছে। সবদিক বিচার-বিশ্লেষণ করে তিনি যথাযথ সিদ্ধান্ত নেবেন।’
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন। জানা গেছে, সেপ্টেম্বরের সংসদ অধিবেশনেই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এ কারণেই সম্ভাব্য প্রার্থী ও বিএনপির বিবেচনার বিষয়গুলো নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তীব্র হয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে মূলত তিনটি বিষয় গুরুত্ব পাবে-দেশ ও দলের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা, দক্ষতা ও প্রজ্ঞা এবং সংকটময় পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় সাহসিকতা।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির ভেতরে অতীতের কয়েকটি অভিজ্ঞতাও আলোচনায় এসেছে। ১৯৯৬ সালের মে মাসে বিএনপি সরকারের রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের সাহসিকতায় তৎকালীন সেনাপ্রধান লে. জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল বলে দলটির নেতারা উল্লেখ করছেন।
অন্যদিকে, ২০০৬ সালে রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকারী অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য থাকলেও অদক্ষতার কারণে তিনি উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হন বলে বিএনপির নেতাদের মধ্যে মূল্যায়ন রয়েছে। এর ফলে এক-এগারোর জরুরি সরকারের প্রেক্ষাপট তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি হিসেবেও তিনি সাহসী ভূমিকা রাখতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০০১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকেও বিএনপি পরবর্তী সময়ে দলীয় প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ বলে মনে করে। রাষ্ট্রপতি থাকাকালে কয়েকটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিএনপির সঙ্গে তাঁর দূরত্ব সৃষ্টি হয়। পরে ২০০২ সালের জুনে তাঁকে অভিশংসনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অতীতের রাষ্ট্রপতিদের সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার একজন সৎ, মর্যাদাসম্পন্ন, মানসম্মত ও সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি করা প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, ‘রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের এক নম্বর ব্যক্তি ও প্রধান নাগরিক। তাই এই পদে একজন সৎ, মর্যাদাসম্পন্ন, মানসম্মত ও সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিকে বসানো উচিত। সরকার দেশের স্বার্থে একজন উপযুক্ত ও যোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেবে, তেমনটাই প্রত্যাশা থাকবে।’
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘নিছক রাজনৈতিক বিচারে বা দলীয় স্বার্থে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়া সমীচীন নয়। যদিও সংসদীয় প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত, তবুও জাতীয় সংকট বা জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রপ্রধান পদে এমন একজন ব্যক্তিত্ব আনা প্রয়োজন, যার কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি অন্ধ বাধ্যবাধকতা থাকবে না। ক্ষমতাসীন দল যদি জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক চর্চাকে আরও শক্তিশালী করবে।’
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘দেশের রাষ্ট্রপতি হতে হবে একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক এবং পূর্ণাঙ্গ অর্থে দলনিরপেক্ষ ব্যক্তি। রাষ্ট্রপতি পদটি যেন কোনো দলীয় অন্ধ আনুগত্য বা কানাঘুষার কেন্দ্রবিন্দু না হয়। যিনি রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হবেন; জনগণ, দেশ এবং সংবিধানের প্রতি তাঁর সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। বিশেষ করে, যে কোনো বিদেশি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁকে শক্ত ও অনড় অবস্থান নিতে হবে।’
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘যিনি সত্যি সত্যি দেশের অভিভাবক হতে পারবেন, তাকেই বিএনপির রাষ্ট্রপতি করা উচিত।’ তাঁর মতে, ‘২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পরে কী ধরনের রাষ্ট্রপতি হওয়া উচিত, কীভাবে হওয়া উচিত, সেটা তো জুলাই সনদের মধ্যে বলা আছে। আমি বলব, জুলাই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হোক। কিন্তু সেটাও তো হবে না। কারণ, উচ্চকক্ষ হচ্ছে না। রাষ্ট্রপতি আগের নিয়মেই হবে।’
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে দেশে ২২ জন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বিতর্কের মুখে পদত্যাগ করেন এবং গণ-অভ্যুত্থানে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতন ঘটে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকারী বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও আওয়ামী লীগের বিবেচনায় তিনি ছিলেন ‘বিশ্বাসঘাতক’। অন্যদিকে সদ্য বিদায়ী মো. সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগের আস্থাভাজন হলেও গণ-অভ্যুত্থানে বিতাড়িত শেখ হাসিনার প্রতি তাঁর দুর্বলতা দেশের মানুষ ভালোভাবে নেয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, রাষ্ট্রপতির যে সম্মান ও মর্যাদা, তা মো. সাহাবুদ্দিন অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
সামগ্রিকভাবে অতীতের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে চায় বিএনপি। একই সঙ্গে এ সিদ্ধান্তকে ঘিরে যতটা সম্ভব বিতর্ক এড়ানোরও চেষ্টা করছে দলটি।
ইমামুল
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- পর্নো তারকা থেকে কলম্বিয়ার সিনেটর দেইসি
- ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির প্রো-ভিসি হলেন অধ্যাপক ড. সালমা বেগম
- ইউজিসির তিন সদস্যকে অব্যাহতি দিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির সুযোগ, আবেদন ২০ আগস্ট পর্যন্ত
- বাজারের ৩৪ টুথপেস্টের ২৬টিতে মিলল মাইক্রোপ্লাস্টিক
- শেয়ারবাজারে আস্থা ফেরাতে ১১ দফা দাবি বিনিয়োগকারীদের
- অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীদের ৫০ হাজার টাকা অনুদান, আবেদন যেভাবে
- ঢাবিতে ৩ শিক্ষক বরখাস্ত, ৪ জনের দায়িত্ব স্থগিত
- বিআইডব্লিউটিসি'র চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করলেন এ টি এম আবদুল বারী ড্যানী
- ঢাবির সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান
- সিন্ডিকেট সভা ঘেরাও করলেন ডাকসু নেতারা
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (২৫ জুলাই)
- শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধা জানালেন নবনিযুক্ত ১২ কর্মকর্তা
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (২৭ জুলাই)
- গাজী নজরুলকে বিয়েতে অনড় ছিল মেয়েটি