ঢাকা, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি: ৫৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট, মূলহোতা আবেদ আলী

২০২৬ জুন ০৫ ২১:৩৬:১৫

প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি: ৫৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট, মূলহোতা আবেদ আলী

নিজস্ব প্রতিবেদক: এক সময় আর্থিক সংকটে থাকা পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলীর জীবনযাত্রায় হঠাৎ করেই বড় পরিবর্তন আসে। অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন। মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার বোতলা গ্রামে নির্মাণ করেন বিলাসবহুল বাড়ি। এছাড়া ঢাকায় একাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাটসহ তার নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। নিজেকে আওয়ামী লীগের নেতা পরিচয় দিয়ে তিনি ডাসার উপজেলা চেয়ারম্যান পদেও প্রচারণা চালিয়েছিলেন বলে জানা যায়।

তদন্তে উঠে এসেছে, বছরের পর বছর পিএসসির প্রশ্নফাঁস বাণিজ্য থেকে অর্জিত অর্থের মাধ্যমেই আবেদ আলী এই সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।

সম্প্রতি এ সংক্রান্ত মামলার চার্জশিটে বিষয়টির বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ১৮ মে আদালতে ৪১ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। বহুল আলোচিত মামলাটি ২০২৪ সালের ৯ জুলাই রাজধানীর পল্টন থানায় দায়ের করা হয়েছিল।

চার্জশিট অনুযায়ী, আবেদ আলীর নেতৃত্বে পরিচালিত ৫৫ সদস্যের একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রশ্নফাঁস কার্যক্রমে জড়িত ছিল। চক্রটিতে পিএসসির কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী এবং পরীক্ষার্থী সংগ্রহকারী দালালদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে গ্রেফতার ৩৬ আসামি হলেন- পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী, মো. নোমান সিদ্দিক, মো. খলিলুর রহমান, পিএসসির অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলাম, ব্যবসায়ী আবু সোলেমান মো. সোহেল, জাহাঙ্গীর আলম, এসএম আলমগীর কবীর, প্রতিরক্ষা ও অর্থ বিভাগের অডিটর প্রিয়নাথ রায়, মো. জাহিদুল ইসলাম, পিএসসির উপপরিচালক (ডিডি) মো. আবু জাফর, মো. শাহাদত হোসেন, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মো. মামুনুর রশিদ, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল টেকনিশিয়ান নিয়ামুল হাসান, ব্যবসায়ী মো. সাখাওয়াত হোসেন, সাইম হোসেন, ড্যাফোডিলের শিক্ষার্থী লিটন সরকার, আবেদ আলীর ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়াম, পিএসসির সাবেক সহকারী পরিচালক নিখিল চন্দ্র রায়, মো. শরীফুল ইসলাম ভূঁইয়া, দীপক বণিক, মো. খোরশেদ আলম খোকন, কাজী মো. সুমন, একেএম গোলাম পারভেজ, মেহেদী হাসান খান, মো. মিজানুর রহমান, আতিকুল ইসলাম, এটিএম মোস্তফা, মাহফুজ কালু, মো. আসলাম হোসেন, কৌশিক দেবনাথ, মোজাহিদুল ইসলাম, মজনু মিয়া, মোহাম্মদ আকরাম হোসেন, মো. আব্দুল আজিম, রুপন চন্দ্র দাস ও মাহামুদ হাসান মান্না।

পলাতক ১৯ আসামি হলেন- সুমন কুমার বসু, বিপাশ চাকমা, মো. দেলোয়ার হোসাইন, মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান দিপু, মো. শহিদুল ইসলাম, মো. আল মামুন, মো. আনিছুর রহমান, মো. ওয়াসিম খান, মো. জসিম উদ্দিন, মো. ফেরদৌস আহম্মদ, মো. মান্নান উদ্দিন, মো. আশরাফুল আলম, জাহিদুল সরদার, মো. সোহেল পারভেজ, মো. জুয়েল আল মামুন, মো. বিল্লাল হোসেন, মো. রুবেল শরীফ, শাকের আহমেদ আল-আমিন এবং এম এম নাজমুল হাসান। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়েছে।

ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় ৩১তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. জাকারিয়া রহমানকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া পলাতক আসামি মো. গোলাম হামিদুর রহমান, হামিদুল ইসলাম জিয়া, মো. মাহাবুব আলম এবং আজাদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় সংগ্রহ করা সম্ভব না হলেও তদন্তে তাদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্তে জানা গেছে, পরীক্ষার আগেই নির্ধারিত প্রার্থীদের কাছে প্রশ্নপত্র ও উত্তর সরবরাহ করা হতো। তাদের নির্দিষ্ট স্থানে এনে প্রশ্ন ও উত্তর মুখস্থ করানো হতো এবং পরে পরীক্ষার কেন্দ্রে পাঠানো হতো। এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আগাম আদায় করা হতো। দেশের বিভিন্ন জেলায় বিস্তৃত এই চক্রে সরকারি চাকরিজীবী, পিএসসির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যবসায়ী, চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ জড়িত ছিলেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বিজি প্রেস থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি এনজিও পর্যন্ত এই নেটওয়ার্কের বিস্তার ছিল।

তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় থাকা এই চক্র পরীক্ষার গোপনীয়তা ভেঙে রাষ্ট্রের নিয়োগব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। চার্জশিটে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন আইন, ২০২৩-এর ১১ ও ১৫ ধারায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিচার চাওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

এছাড়া চক্রের কয়েকজন সদস্যের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের তথ্যও পাওয়া গেছে। এসব সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং সম্ভাব্য অর্থপাচারের বিষয়টি তদন্তের জন্য পৃথক উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, মানি লন্ডারিং নিয়ে আলাদা তদন্ত শুরু হলে প্রশ্নফাঁস বাণিজ্যের আর্থিক ব্যাপ্তি সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে।

চার্জশিটে পুরো ঘটনাকে রাষ্ট্রের নিয়োগব্যবস্থার বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি সুপরিকল্পিত অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে গেলে প্রশ্নফাঁস সিন্ডিকেটের আড়ালে থাকা আরও প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার তথ্যও প্রকাশ্যে আসতে পারে।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত