ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শেয়ারবাজারকে ‘ইমার্জিং মার্কেট’ বানানোর রোডম্যাপ নতুন বিএসইসি প্রধানের
অর্থনীতি ডেস্ক: দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং এর আমূল কাঠামোগত সংস্কারে একটি সুসংগঠিত ও দূরদর্শী নীতিগত রোডম্যাপ ঘোষণা করেছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মাসুদ খান। দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজের প্রথম আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট জানান, কমিশনের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের শেয়ারবাজারকে কেবল সাধারণ খুচরা বিনিয়োগকারী-নির্ভর ‘ফ্রন্টিয়ার মার্কেট’ থেকে বের করে এনে একটি নির্ভরযোগ্য, স্বচ্ছ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ-নির্ভর 'ইমার্জিং মার্কেটে' রূপান্তর করা। যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদে দেশি ও বিদেশি বড় মূলধন জোগাড় করতে সক্ষম হবে।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বিএসইসি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও শেয়ারবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকসহ বিএসইসির নবনিযুক্ত কমিশনারবৃন্দ।
শেয়ারবাজারের এই রূপান্তরে প্রযুক্তির ব্যবহারকে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন নতুন চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, আইপিও, রাইটস ইস্যু, বন্ড ও সুকুক আবেদন থেকে শুরু করে লাইসেন্সিং এবং নিয়ন্ত্রক দাখিলপ্রক্রিয়া ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হবে। এর ফলে কাজের স্বচ্ছতা বাড়ার পাশাপাশি সময় ও খরচ দুটোই কমবে।
তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, একটি আধুনিক শেয়ারবাজার কখনোই সনাতনী কাগজ-নির্ভর ও ম্যানুয়াল কার্যপ্রবাহ দিয়ে দক্ষতার সঙ্গে চালানো সম্ভব নয়। তাই ডিজিটাইজেশনই হবে আমাদের প্রধান স্তম্ভ। আমরা ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রক রিপোর্টিং, কোম্পানির তথ্য প্রকাশ, বাজার তদারকি, আইন প্রয়োগ ও বিনিয়োগকারী সেবাসহ পুরো ইকোসিস্টেমকে ডিজিটাল করতে চাই।
বিএসইসি প্রধান আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ও সক্ষমতা বহুগুণ বাড়লেও শেয়ারবাজার সেই প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখতে পারেনি। এর ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারিয়েছেন, ভালো মানের কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে নিরুৎসাহিত হয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। এই নেতিবাচক পরিস্থিতি পরিবর্তনে কমিশন ধারাবাহিক ও টেকসই সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের মূল দর্শন হবে— যেখানে প্রয়োজন সেখানে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, আর যেখানে সম্ভব সেখানে প্রক্রিয়া সরলীকরণ।
চেয়ারম্যান স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, কমিশনের কাজ কখনোই কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম নিয়ন্ত্রণ করা বা বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামায় হস্তক্ষেপ করা নয়; বরং সবার জন্য ন্যায্য মূল্য এবং তথ্যের সমান প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। ইনসাইডার ট্রেডিং, সার্কুলার ট্রেডিং, ওয়াশ ট্রেড, পাম্প-অ্যান্ড-ডাম্প এবং ফ্রন্ট রানিংসহ পুঁজিবাজারের সব ধরনের অনিয়ম ও কারসাজি দ্রুত চিহ্নিত করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাজারের সততা রক্ষায় প্রয়োজনে তাৎক্ষণিকভাবে লেনদেন স্থগিত করতেও দ্বিধা করবে না কমিশন।
নীতিমালার ক্ষেত্রে আরও স্মার্ট, নীতিনির্ভর ও ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখেই অপ্রয়োজনীয় রিপোর্টিং ও কমপ্লায়েন্সের বোঝা কমাতে বিদ্যমান বিধিমালা পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে মিল রেখে ত্রৈমাসিক ও অন্তর্বর্তীকালীন আর্থিক প্রতিবেদন কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ভালো মানের তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বাড়াতে বহুজাতিক, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বড় স্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে আনতে সক্রিয় ভূমিকা নেবে কমিশন। কর সুবিধা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পে সুশাসন জোরদার এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণও এই নতুন এজেন্ডার অংশ।
বক্তব্যের শেষে চেয়ারম্যান বলেন, আস্থা শুধু মুখে বড় বড় কথা বা বক্তৃতার মাধ্যমে তৈরি হয় না; আস্থা আসে সততা, স্বচ্ছতা, ধারাবাহিক নীতিমালা ও কঠোর জবাবদিহিতার মাধ্যমে। সেই বিশ্বাস পুনর্গঠনের লক্ষ্যেই আমাদের এই নতুন যাত্রা।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর গনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও বড় করতে হলে ব্যাংকিং খাতের একক নির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারকে একটি আঞ্চলিক পাওয়ার হাউসে রূপান্তর করা অপরিহার্য। বড় বড় মেগা প্রকল্পে অর্থায়নে ব্যাংকের সীমাবদ্ধতা থাকায় ক্যাপিটাল মার্কেটই একমাত্র ভরসা। এজন্য মিউচুয়াল ফান্ডের প্রবৃদ্ধি, ইস্যুকারী ও সিস্টেমের ত্রুটি দূর করা এবং নতুন বৈচিত্র্যময় প্রোডাক্ট আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সেলফ-রেগুলেশন বা স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালুর তাগিদ দেন তিনি।
নতুন কমিশনার নাফিজ আল তারিক বলেন, ক্যাপিটাল মার্কেট বর্তমানে একটি বড় ক্রান্তিলগ্ন ও আস্থার সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন সময়ে আমরা দায়িত্ব নিয়েছি। আমরা সবাই একটি দল হিসেবে কাজ করব, যাতে দ্রুততম সময়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা যায়।
আরেক নতুন কমিশনার তানভীর হাবিব রহমান তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, লন্ডনের পুঁজিবাজারের সেরা ও আধুনিক চর্চাগুলো আমি এখানে কাজে লাগাতে চাই। এই নতুন টিমে যুক্ত হতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। একই সাথে কমিশনার নাহিদ মাহতাব আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সবার যদি সদিচ্ছা থাকে এবং আমরা যদি সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারি, তবে দেশের শেয়ারবাজারের উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।
উল্লেখ্য, আজ বৃহস্পতিবার সকালেই দেশের শেয়ারবাজারে এক বড় প্রশাসনিক রদবদল ঘটে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে একযোগে পদত্যাগপত্র জমা দেন বিএসইসির বিদায়ী চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ, কমিশনার মু. মহসীন চৌধুরী, মো. আলী আকবর, ফারজানা লালারুখ ও মো. সাইফুদ্দিন। এরপরই সরকার নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মাসুদ খানকে এবং কমিশনার হিসেবে ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের এমডি মো. নাফিজ আল তারিক, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাহিদ মাহতাব ও আশা ইন্টারন্যাশনালের ফাইন্যান্স ডিরেক্টর তানভীর হাবিব রহমানকে নিয়োগ দেয়। নিয়োগের পরপরই আজ তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বিএসইসিতে যোগদান করেন।
এমজে/
শেয়ারবাজারের বিশ্লেষণ ও ইনসাইড স্টোরি পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- বাংলাদেশ বনাম ভারতের ফুটবল ম্যাচ: সরাসরি দেখুন (LIVE)
- ঢাবি অ্যালামনাই ইউকে শাখার পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা
- আজ রাত ৮ টায় ভারত বনাম বাংলাদেশের ফুটবল ম্যাচ, কোথায় ও যেভাবে দেখবেন?
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিলেন ববি হাজ্জাজ
- ঢাবি ক্যাম্পাসে ববি হাজ্জাজকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা
- ববি হাজ্জাজের বক্তব্যের বিরুদ্ধে মাঠে নামছেন ঢাবি শিক্ষার্থীরা
- ববি হাজ্জাজের বক্তব্যে ক্ষুব্ধ ঢাবি শিক্ষক, বললেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় নয়
- মাসিক ফি দিয়ে ব্যবহার করতে হবে ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম
- নতুন পে-স্কেলে কার বেতন কত বাড়তে পারে? আলোচনায় দুটি প্রস্তাব
- টাইমস হায়ার ও কিউএস র্যাঙ্কিংয়ে ঢাবির জয়জয়কার
- পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই: ড. নিয়াজ আহমদ
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য ববি হাজ্জাজের
- ঢাবির এসএম হলের নতুন প্রভোস্ট অধ্যাপক আবদুস সালাম
- ৩২ হাজার প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ কবে, জানালেন প্রতিমন্ত্রী
- ডিএসইতে রেকর্ড উত্থান, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাড়ছে প্রত্যাশা