ঢাকা, সোমবার, ১ জুন ২০২৬, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বাজার বাঁচাতে গিয়ে নিজেই ডুবছে আইসিবি
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শেয়ারবাজারের একসময়ের অতন্দ্রপ্রহরী এবং চরম সংকটকালীন ‘লাস্ট রিসোর্ট’ হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ সংস্থা ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) এখন নিজেই তীব্র অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। বছরের পর বছর ধরে চলা ধারাবাহিক লোকসান, উচ্চ সুদের ঋণের পাহাড়, অনাদায়ি বিপুল বিনিয়োগ এবং পুঞ্জীভূত অনিয়ম-দুর্নীতির মরণকামড়ে প্রতিষ্ঠানটি আজ কার্যত দেউলিয়া হওয়ার খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আইসিবির বর্তমান এই বিপর্যয় কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ভুল বিনিয়োগনীতি, প্রভাবশালী মহলের অশুভ হস্তক্ষেপ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দীর্ঘদিনের চরম তদারকি ব্যর্থতার এক ভয়াবহ সম্মিলিত খেসারত।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১০-১২ সালের ঐতিহাসিক বাজার ধসের পর শেয়ারবাজারকে টেনে তোলার মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আইসিবিকে। কিন্তু শেয়ারের গুণগত মান বিবেচনা না করে কৃত্রিম উপায়ে সূচক ধরে রাখার ভুল চেষ্টায় প্রতিষ্ঠানটি শুরুতেই বিপুল পরিমাণ ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্বল শেয়ারে আটকে পড়ে। পরবর্তীতে ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী চক্রের সুপারিশে বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি দামে অত্যন্ত দুর্বল ও জাঙ্ক কোম্পানির শেয়ার কেনা শুরু হয়। অসাধু চক্র ও তৎকালীন প্রশাসনের যোগসাজশে ব্লক মার্কেটে চলে অবাধ লেনদেন, যা বাজারে কারসাজিকারীদের কৃত্রিমভাবে দাম বাড়িয়ে শেয়ার গছিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। এই অদূরদর্শী বিনিয়োগের ফলে আইসিবি নিজেই চরম তারল্য সংকটে নিমজ্জিত হয়। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে তৎকালীন কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে বাজারে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখায় প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি ঋণনির্ভর হয়ে পড়ে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
বর্তমানে তীব্র আর্থিক সংকটে থাকা ১২টি লিজিং কোম্পানি ও দুর্বল ব্যাংকে আইসিবির ১ হাজার ২০৫ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত বা এফডিআর আটকে গেছে, যা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। অথচ বিভিন্ন উৎস থেকে নেওয়া ঋণের চড়া সুদ বাবদই আইসিবিকে প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে, যেখানে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব বার্ষিক পরিচালন ব্যয় মাত্র ১০০ কোটি টাকা। আইসিবির এই তারল্য সংকট এখন আর একক কোনো প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সোনালী, জনতা ও অগ্রণীর মতো রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহৎ ব্যাংকগুলো আইসিবিকে বিপুল ঋণ দিয়েছিল। আইসিবি সময়মতো এই ঋণ ও সুদ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন বড় ধরনের মূলধন ও প্রভিশন সংকটে পড়েছে, যা পরোক্ষভাবে দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আর্থিক খতিয়ান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সংস্থাটি রেকর্ড ১২১ কোটি ৪০ লাখ টাকার লোকসান গুনেছে এবং চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকেই লোকসানের খতিয়ানে যোগ হয়েছে আরও ১৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নতুন করে ভালো মানের ‘এ’ ক্যাটাগরির শেয়ারে বিনিয়োগ করে কিছু মুনাফা করলেও, আইনি ও নীতিগত জটিলতার কারণে তা মূল আর্থিক প্রতিবেদনে আয় হিসাবে দেখাতে পারছে না। ফলে কাগজ-কলমে লোকসানের পাল্লাই ভারী হচ্ছে। যদিও বর্তমান পর্ষদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্লক ট্রেড বন্ধ করা, শুধু ‘এ’ ক্যাটাগরির শেয়ারে বিনিয়োগ এবং বকেয়া পরিশোধের জন্য প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার নতুন সরকারি তহবিলের আবেদন করার মতো কিছু কঠোর উদ্যোগ নিয়েছে।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক মো. আল-আমীন মনে করেন, দীর্ঘদিন অডিট ও তদারকির ঘাটতি থাকায় অনিয়মকারীরা পার পেয়ে গেছে। এখন শুধু সরকারি অর্থসহায়তা বা বেলআউট দিয়ে আইসিবিকে বাঁচানো যাবে না। সবার আগে এর জন্য একটি গভীর ফরেনসিক অডিট প্রয়োজন এবং বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আমূল কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে। শেয়ারবাজারকে যদি তার স্বাভাবিক গতিতে ফেরাতে হয়, তবে আইসিবিকে নিজের পায়ে দাঁড় করানো জরুরি। তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন—সরকারের বিশেষ প্যাকেজে আইসিবি কি সত্যিই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, নাকি পাহাড়সম এই দুর্নীতির দায়ভার শেষ পর্যন্ত সাধারণ করদাতাদের কাঁধেই চাপবে।
এমজে/
শেয়ারবাজারের বিশ্লেষণ ও ইনসাইড স্টোরি পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- বাংলাদেশ বনাম ভারতের ফুটবল ম্যাচ: সরাসরি দেখুন (LIVE)
- আজ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে মাদ্রাসা শিক্ষকদের পদযাত্রা
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিলেন ববি হাজ্জাজ
- আজ রাত ৮ টায় ভারত বনাম বাংলাদেশের ফুটবল ম্যাচ, কোথায় ও যেভাবে দেখবেন?
- ঢাবি ক্যাম্পাসে ববি হাজ্জাজকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা
- রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প
- ববি হাজ্জাজের বক্তব্যে ক্ষুব্ধ ঢাবি শিক্ষক, বললেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় নয়
- শোলাকিয়া থেকে জাতীয় ঈদগাহ কোথায় কখন ঈদের জামাত, জেনে নিন বিস্তারিত
- ফ্রান্সের উদ্দেশ্য দেশ ছাড়লেন ড. ইউনূস
- ববি হাজ্জাজের বক্তব্যের বিরুদ্ধে মাঠে নামছেন ঢাবি শিক্ষার্থীরা
- সাত দিনের ছুুটিতে সীমিত পরিসরে আজও খোলা ব্যাংক
- বিশ্ববাজারে আবারও বাড়ল তেলের দাম
- বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীসহ দেশবাসীকে ঢাবি অ্যালামনাইয়ের ঈদের শুভেচ্ছা
- গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ: আইল্যান্ড সিকিউরিটিজকে অর্থ ফেরতের নির্দেশ
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য ববি হাজ্জাজের