ঢাকা, শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬, ৭ চৈত্র ১৪৩২

শেয়ারবাজারে কারসাজির অভিযোগে চার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত

২০২৬ মার্চ ২১ ২৩:২৬:৩৭

শেয়ারবাজারে কারসাজির অভিযোগে চার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে অনিয়মের অভিযোগে চারটি মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

বিএসইসি পৃথক নির্দেশনার মাধ্যমে এনআরবিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেড, প্রিমিয়ার লিজিং সিকিউরিটিজ লিমিটেড, গ্রিন ডেল্টা সিকিউরিটিজ লিমিটেড এবং লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে। এর মধ্যে লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্টস একটি মার্চেন্ট ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

গত ১১ মার্চ তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য চারটি পৃথক কমিটি গঠন করা হয়। বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম আগামীর সময়কে জানান, এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রমে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে নেগেটিভ ইকুইটি, মার্জিন ঋণ, আর্থিক প্রতিবেদন এবং কর্পোরেট গভর্ন্যান্স সংক্রান্ত বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।

তিনি বলেন, এসব অনিয়ম বাজারে ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির কারণ হতে পারে। তদন্ত শেষ হলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। এনআরবিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজের তদন্তে নেতৃত্ব দিচ্ছেন উপপরিচালক মো. রফিকুন্নবী এবং সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ সাদেকুর রহমান ভূঁইয়া। প্রিমিয়ার লিজিং সিকিউরিটিজের তদন্তে রয়েছেন অতিরিক্ত পরিচালক মো. ওহিদুল ইসলাম ও সহকারী পরিচালক মো. মারুফ হাসান।

লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্টসের তদন্তে দায়িত্ব পেয়েছেন অতিরিক্ত পরিচালক (লিগ্যাল) মুহাম্মদ জিয়াউর রহমান এবং সহকারী পরিচালক অমিত কুমার সাহা। অন্যদিকে গ্রিন ডেল্টা সিকিউরিটিজের তদন্ত করছেন অতিরিক্ত পরিচালক উম্মে সালমা ও সহকারী পরিচালক মো. মতিউর রহমান। ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তদন্তে বিশেষভাবে দেখা হবে, নেগেটিভ ইকুইটি থাকা সত্ত্বেও কোনো প্রতিষ্ঠান ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণায় সহায়তা করেছে কিনা। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করতে পারে এবং প্রকৃত আর্থিক অবস্থা গোপন করতে পারে বলে মনে করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

বিশেষ করে এনআরবিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজ ও লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্টসের ক্ষেত্রে এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রকের কাছে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে নেগেটিভ ইকুইটি তথ্য গোপন বা ভুলভাবে উপস্থাপনের অভিযোগও তদন্তাধীন রয়েছে। এনআরবিসির বিরুদ্ধে তথ্য বিকৃতি ও কারসাজির অভিযোগ রয়েছে।

প্রিমিয়ার লিজিং সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা ক্লায়েন্টদের পাওনা যথাযথ প্রভিশন ছাড়াই সম্পদ হিসেবে দেখিয়েছে, যা আর্থিক ঝুঁকি কম দেখানোর কৌশল হতে পারে। একই সঙ্গে চারটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই নির্ধারিত সময়ে নেগেটিভ ইকুইটি ও অবাস্তব ক্ষতির বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রভিশন না রাখার অভিযোগ উঠেছে।

গ্রিন ডেল্টা সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে নেগেটিভ ইকুইটি হিসাব পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আগের বছরের সুদ মূলধনে যুক্ত করা, সুদ ও মূলধনের অমিল এবং প্রয়োজনীয় প্রভিশনের ঘাটতির বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে। তবে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াফি শফিক মেনহাজ খান জানিয়েছেন, এটি নিয়মিত তদন্তের অংশ এবং তারা কমিশনের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন।

এছাড়া মার্জিন ঋণ বিতরণে সীমা লঙ্ঘন, নিয়মবহির্ভূত কার্যক্রম এবং যথাযথ অনুমতি ছাড়া ক্যাশ হিসাবকে মার্জিন বা নেগেটিভ ইকুইটি হিসেবে রূপান্তরের অভিযোগও তদন্তে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে গ্রাহকের সম্মতি ছাড়াই মার্জিন হিসাব খোলার বিষয়ও উঠে এসেছে।

বিএসইসি অভিযোগ করেছে, কিছু প্রতিষ্ঠান নেগেটিভ ইকুইটি ব্যবহার করে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারে লেনদেন করেছে এবং অবৈধ ব্লক ও বাল্ক ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে শেয়ারদর প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে এনআরবিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজ ও প্রিমিয়ার লিজিং সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্টসের ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিবেদনে ‘ইন্টারেস্ট সাসপেন্স’ হিসাব ব্যবহারের যথার্থতা এবং উপস্থাপনাও তদন্তাধীন। এছাড়া লংকাবাংলা ফাইন্যান্স লিমিটেডের প্রায় ১০৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা সুদ পরিশোধের দায় স্বীকার না করার অভিযোগ রয়েছে, যা মুনাফা অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপনের ইঙ্গিত দিতে পারে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, এসব অনিয়মে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা পর্ষদ এবং কর্মকর্তাদের ভূমিকা ও দায় নির্ধারণ করা হবে। কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের দুর্বলতার কারণেই দীর্ঘদিন ধরে এসব অনিয়ম চলেছে বলে মনে করছে বিএসইসি।

এএসএম/

শেয়ারবাজারের বিশ্লেষণ ও ইনসাইড স্টোরি পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত