ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২
শিক্ষায় সনদ বাড়ছে, কমছে শেখার মান: প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদক: ভর্তি, অবকাঠামো ও পরীক্ষায় উত্তীর্ণের হার—এই তিন সূচকে গত দুই দশকে বড় অগ্রগতির দাবি করা হলেও দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখার মান আশানুরূপ নয়। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি ও অসংগতি পর্যালোচনায় গঠিত একটি কমিটির খসড়া প্রতিবেদনে এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়মিত শ্রেণি উত্তীর্ণ হওয়া ও সনদ প্রাপ্তির হার বাড়লেও শিক্ষার্থীদের মৌলিক পড়া, লেখা, গণিত ও ধারণাভিত্তিক দক্ষতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় গড়ে উঠছে না। ফলে আত্মবিশ্বাস, বিশ্লেষণক্ষমতা ও কর্মজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতায় বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার ও অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ সচিবালয়ের অর্থ বিভাগের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সভায় খসড়া প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র লেকচারার অনন্ত নীলিম।
খসড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত দুই দশকে বিদ্যালয়ে ভর্তি ও শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ও পাসের হারও আগের তুলনায় বেশি। দীর্ঘদিন এসব সূচককেই শিক্ষার সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়েছে। তবে বাস্তবে বহু শিক্ষার্থী সাবলীলভাবে পড়তে পারে না, মৌলিক গণিতে দুর্বল এবং বিষয়বস্তুর ধারণা বোঝা ও প্রয়োগে পিছিয়ে রয়েছে। প্রতিবেদনের ভাষায়, “সনদের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু শেখার মান বাড়েনি।”
কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, দৃশ্যমান সাফল্যের সূচক বাড়তে থাকায় দুর্বল শেখা নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপের তাগিদ তৈরি হয়নি। পরীক্ষার ফল এমনভাবে সামঞ্জস্য করা হয়েছে, যাতে সামগ্রিক চিত্র স্থিতিশীল মনে হয়। এর ফলে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও প্রকৃত শেখার মধ্যকার ব্যবধান দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থেকেছে।
প্রতিবেদন সতর্ক করে বলেছে, এই পরিস্থিতির প্রভাব এখন জরুরি পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ বর্তমানে জনমিতিক সুবিধার সময়ের শেষ দিকে রয়েছে। শিগগিরই বর্তমান শিক্ষার্থীরা শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে বহু তরুণ সনদ নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করলেও প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে উৎপাদনশীলতা কম থাকবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হতে পারে।
সামাজিক প্রভাবের দিকটিও প্রতিবেদনে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। দুর্বল শেখা সত্ত্বেও উত্তীর্ণ হওয়ার ফলে পরিবারগুলো ধরে নেয় যে সন্তানরা সঠিক পথে রয়েছে। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনে বিনিয়োগ করে ঘাটতি পূরণ করে; কিন্তু যাদের সামর্থ্য নেই, তারা আরও পিছিয়ে পড়ে। এতে বৈষম্য বাড়ে এবং সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যায়।
কমিটির মতে, শেখা পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামো ও পরিচালন পদ্ধতির মধ্যেই নিহিত। এখানে সাফল্য মাপা হয় সহজে গণনাযোগ্য সূচকে, কিন্তু শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কতটা শিখছে—তা পরিমাপের কার্যকর ব্যবস্থা দুর্বল। পাঠ্যক্রম সময়ের সঙ্গে ভারী ও অবাস্তব হয়ে উঠেছে, ফলে বিষয় বোঝার চেয়ে সিলেবাস শেষ করাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদন আরও জানায়, মূল্যায়ন ব্যবস্থার দুর্বলতাও এই সংকটকে বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ, আর প্রত্যাশার সঙ্গে ফল না মিললে নানা কৌশলে ফল সামঞ্জস্য করা হয়েছে। এতে দৃশ্যমান ব্যর্থতা কমলেও শেখার প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে কমিটি কয়েকটি মৌলিক সংস্কারের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে— শেখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া, পাঠ্যক্রম সংক্ষিপ্ত ও বাস্তবসম্মত করা, প্রাথমিক স্তরে পড়া-লেখা ও গণিতের ভিত্তি শক্ত করা, মূল্যায়ন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষভিত্তিক বাস্তব পাঠদানে সহায়তা জোরদার করা।
প্রতিবেদনে শেখার উন্নয়নে পাঁচটি নির্ণায়ক পরিবর্তনের কথাও বলা হয়েছে। এগুলো হলো— শেখার সঙ্গে বাস্তব পরিণতি যুক্ত করা, ব্যবস্থার সব বার্তা শেখামুখী করা, শেখার দায় পরিবার থেকে ব্যবস্থার ওপর ফিরিয়ে আনা, শ্রেণিকক্ষে কাজে লাগে এমন তথ্য সময়মতো সরবরাহ করা এবং অতিরিক্ত পাঠ্য ও প্রশাসনিক বোঝা কমানো।
প্রতিবেদন বলছে, আগামী পাঁচ বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে নীতিমালা, রুটিন ও প্রত্যাশা নতুন করে নির্ধারণ করা গেলে বাংলাদেশ ‘বৃহৎ পরিসরে বিদ্যালয়’ থেকে ‘বৃহৎ পরিসরে শেখা’র দিকে অগ্রসর হতে পারবে। প্রস্তাবিত ভিশন বাস্তবায়নের দায়িত্ব ন্যাশনাল লার্নিং ইমপ্লিমেন্টেশন ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন। উদ্বোধনী বক্তব্য দেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, ক্যাম্পের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক সি. আর. আবরার।
এমজে/
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- ইপিএস প্রকাশ করেছে বিডি থাই ফুড
- কী আছে এপস্টেইন ফাইলে? কেন এত হইচই বিশ্বজুড়ে?
- ইপিএস প্রকাশ করেছে কনফিডেন্স সিমেন্ট
- ইপিএস প্রকাশ করেছে সোনালী পেপার
- ইপিএস প্রকাশ করেছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস
- ইপিএস প্রকাশ করেছে ইজেনারেশন
- ইপিএস প্রকাশ করেছে সিলকো ফার্মা
- ইপিএস প্রকাশ করেছে সাফকো স্পিনিং
- ইপিএস প্রকাশ করেছে বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস
- ইপিএস প্রকাশ করেছে ইন্দো-বাংলা ফার্মা
- নতুন জাতীয় দৈনিকে ক্যারিয়ার গড়ার বড় সুযোগ
- ইপিএস প্রকাশ করেছে ইনটেক
- ইপিএস প্রকাশ করেছে এসিআই
- এক লাফে ভরিতে ১৪ হাজার টাকা কমলো সোনার দাম
- ইপিএস প্রকাশ করেছে গোল্ডেন সন