ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২

খালেদা জিয়ার মৃ'ত্যুর পেছনে ‘ইচ্ছাকৃত চিকিৎসা অবহেলা’র অভিযোগ

২০২৬ জানুয়ারি ১৬ ২০:৩৪:১৪

খালেদা জিয়ার মৃ'ত্যুর পেছনে ‘ইচ্ছাকৃত চিকিৎসা অবহেলা’র অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গুরুতর অবহেলা ছিল এবং সেই অবহেলাই তাকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে এমন বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী। তিনি বলেছেন, এ ঘটনায় সরকারের উচিত অবিলম্বে খালেদা জিয়ার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করা।

শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ‘নাগরিক সমাজ’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এক শোকসভায় এসব কথা বলেন তিনি।

ডা. এফ এম সিদ্দিকী জানান, ২০২১ সালের ২৭ এপ্রিল কোভিড-১৯ জনিত জটিলতা নিয়ে খালেদা জিয়া এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হলে বর্তমান মেডিকেল বোর্ড তার চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ভর্তির পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তারা দেখতে পান, তিনি লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত। বিষয়টি তাদের জন্য ছিল বিস্ময়কর ও গভীর উদ্বেগের।

তিনি বলেন, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া চিকিৎসা ছাড়পত্র অনুযায়ী খালেদা জিয়াকে রিউমাটয়েড আর্থাইটিসের জন্য নিয়মিত Methotrexate (MTX) নামের একটি ওষুধ সেবনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং ভর্তি অবস্থাতেও তাকে এই ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে। অথচ MTX গ্রহণের ফলে লিভারের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে এই ঝুঁকি উপেক্ষা করা হয়েছে। মেডিকেল বোর্ড দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ওষুধটি বন্ধ করা হয়।

ডা. সিদ্দিকী বলেন, খালেদা জিয়া আগে থেকেই MAFLD বা ফ্যাটি লিভার ডিজিজে ভুগছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে Methotrexate ব্যবহারের সময় নিয়মিত লিভার ফাংশন টেস্ট ও প্রয়োজনে আল্ট্রাসনোগ্রাম করা ছিল অত্যাবশ্যক। কিন্তু লিভার ফাংশন টেস্টে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ার পরও সরকার নির্ধারিত চিকিৎসকরা কোনো আল্ট্রাসনোগ্রাম করেননি এবং MTX বন্ধও করেননি।

তিনি আরও জানান, তৎকালীন চিকিৎসকদের ওপর আস্থার অভাবে খালেদা জিয়া হাসপাতালে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করতে রাজি হননি। তবে অবস্থার গুরুত্ব বিবেচনায় তার আস্থাভাজন চিকিৎসকের মাধ্যমে বেডসাইডে Point of Care Ultrasound (POCUS) করা যেত। অন্ততপক্ষে MTX বন্ধ করা ছিল ন্যূনতম দায়িত্ব, যা পালন করা হয়নি।

অনেকের প্রশ্নের জবাবে ডা. সিদ্দিকী বলেন, খালেদা জিয়াকে ধীরে ধীরে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না এই প্রশ্ন ওঠে। তার ব্যাখ্যায়, Methotrexate-ই এমন একটি ওষুধ ছিল, যা তার ফ্যাটি লিভার ডিজিজকে দ্রুত সিরোসিসে রূপান্তরিত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে এটি তার লিভারের জন্য ‘স্লো পয়জন’-এর মতো কাজ করেছে।

তিনি বলেন, আজ দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে এক গভীর বেদনা গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের জন্য আজীবন সংগ্রাম করা এই মানুষটি যদি আর কিছুদিন বেঁচে থাকতেন! যদি দেখতে পেতেন, মানুষ ভয়হীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছে।

ডা. এফ এম সিদ্দিকীর অভিযোগ, চিকিৎসায় ধারাবাহিক অবহেলা এবং লিভার ফাংশনের দ্রুত অবনতি পরিকল্পিতভাবেই খালেদা জিয়াকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। এটি কেবল অবহেলা নয়, বরং একটি অমার্জনীয় অপরাধ। তিনি বলেন, এটি সুদূরপ্রসারী কোনো হত্যাপরিকল্পনার অংশ ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা জরুরি। পাশাপাশি তার ডায়াবেটিস ও আর্থাইটিস চিকিৎসায়ও অবহেলার স্পষ্ট প্রমাণ মেডিকেল বোর্ডের কাছে রয়েছে।

এ কারণে তিনি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানান। তদন্তে সরকার গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্যদের যোগ্যতা ও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, ভর্তি থাকা অবস্থায় কোন কোন চিকিৎসক চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং চিকিৎসায় অবহেলার প্রমাণ রয়েছে কি না এসব বিষয় খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি খালেদা জিয়া আইনজীবীর মাধ্যমে ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলে তাতে কারা বাধা দিয়েছিল, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি করেন।

শেষে ডা. সিদ্দিকী বলেন, সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত সব নথি আইনগতভাবে জব্দ করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া উচিত। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার দ্রুত তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেবে। তার ভাষায়, “Justice delayed is justice denied।”

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত