ঢাকা, শুক্রবার, ২ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮ পৌষ ১৪৩২
গৃহবধূ থেকে ‘আপসহীন’ নেত্রী: খালেদা জিয়ার বর্ণাঢ্য ও কণ্টকময় পথচলার মহাপ্রয়াণ
নিজস্ব প্রতিবেদক: অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়ির চা-বাগান ঘেরা শান্ত জনপদে বেড়ে ওঠা যে কিশোরীর ডাকনাম ছিল ‘পুতুল’, তাঁর ললাটে যে একদিন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের শাসনভার লেখা থাকবে, তা হয়তো সমকালীন বাস্তবতায় ছিল অকল্পনীয়। বেগম খালেদা জিয়ার জীবন পরিক্রমা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন, বরং সময়ের প্রয়োজনে সাধারণ গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রনায়কে রূপান্তরিত হওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ১৯৬০ সালে তরুণ সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার পর দীর্ঘ দুই দশক তিনি নিজেকে কেবল পারিবারিক গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। এমনকি ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হলেও খালেদা জিয়া রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার বাইরে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেননি। তবে ১৯৮১ সালে স্বামীর নির্মম হত্যাকাণ্ড তাঁর জীবনের গতিপথ আমূল বদলে দেয়। বিএনপির তৎকালীন নেতৃত্ব সংকট এবং নেতা-কর্মীদের আকুল আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৮২ সালে তিনি রাজনীতিতে নামতে বাধ্য হন, যা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থানের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হলো স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয় বছরের আপসহীন সংগ্রাম। তৎকালীন সেনাপ্রধান এরশাদ যখন বিচারপতি সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করেন, তখন থেকেই খালেদা জিয়া অকুতোভয় প্রতিরোধের প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে এরশাদ যখন বিএনপিকে ১২৬টি আসনের টোপ দিয়ে আন্দোলনকে স্তিমিত করতে চেয়েছিলেন, তখন খালেদা জিয়া সেই প্রলোভন ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁর এই অনমনীয় দৃঢ়তাই তাঁকে বাংলাদেশের মানুষের কাছে ‘আপসহীন’ নেত্রীর আসনে বসায়। বিপরীতে অন্য অনেক দল যখন ক্ষমতার ভাগাভাগিতে ব্যস্ত ছিল, তিনি তখন তৃণমূল পর্যায়ে দল গোছাতে এবং নারী ভোটারদের রাজনীতির মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, যা ছিল তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার এক চূড়ান্ত স্বীকৃতি।
তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন খালেদা জিয়ার শাসনামল ছিল সাফল্য ও বিতর্কের এক মিশ্র প্রতিফলন। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন, প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা এবং নারী শিক্ষার প্রসারে উপবৃত্তি চালুর মতো পদক্ষেপগুলো তাঁর সরকারের যুগান্তকারী সাফল্য হিসেবে স্বীকৃত। বিশেষ করে ২০০৩ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠন এবং অবকাঠামো উন্নয়নে তাঁর সরকারের ভূমিকা এ দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তবে সাফল্যের সমান্তরালে তাঁর শাসনামলে দুর্নীতির অভিযোগ এবং উগ্রবাদের উত্থান নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে তাঁকে বেশ কিছু বিতর্কের মাশুল দিতে হয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর দলের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় শুরু হয় ২০০৭ সালের ‘ওয়ান-ইলেভেন’ পরবর্তী সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। কারাগার থেকে শুরু করে ২৮ বছরের স্মৃতিবিজড়িত মইনুল রোডের বাসভবন থেকে উচ্ছেদ হওয়ার দৃশ্য ছিল তাঁর জীবন সংগ্রামের চরম নিষ্ঠুরতা। এরপর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যু এবং বড় ছেলে তারেক রহমানের নির্বাসিত জীবন তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে দিলেও তিনি রাজনৈতিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে নির্জন কারাগারে কাটানো সময়গুলো ছিল তাঁর শারীরিক ও মানসিক সহনশীলতার এক অগ্নিপরীক্ষা। দীর্ঘ সময় কারাবাস ও উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে তিনি লিভার সিরোসিস, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতাসহ নানাবিধ মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হন। তবুও তিনি নতি স্বীকার করেননি, যা তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রের দৃঢ়তাকে পুনরায় প্রমাণ করে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর খালেদা জিয়ার মুক্তি ছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বন্দিদশার অবসান ঘটিয়ে মুক্ত পরিবেশে ফিরলেও ভগ্ন স্বাস্থ্য তাঁকে আর আগের মতো সক্রিয় হওয়ার সুযোগ দেয়নি। উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যাওয়া এবং সেখান থেকে ফিরে আসা ছিল তাঁর জীবনের শেষ লড়াকু পদক্ষেপ। অবশেষে ৮০ বছর বয়সে জীবনের ক্লান্তি ঝেড়ে তিনি মহাপ্রস্থানের পথে পা বাড়ালেন।
খালেদা জিয়ার বর্ণাঢ্য জীবনের মূল্যায়ন করতে গিয়ে এ কথা স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদের এক শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর দীর্ঘ লড়াই, কারাগার থেকে রাজপথের সংগ্রাম এবং অসংখ্য মামলার মোকাবিলা তাঁকে ইতিহাসের পাতায় কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে অমর করে রাখবে।
এমজে/
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- রাজশাহী ওয়ারিয়র্স বনাম নোয়াখালী এক্সপ্রেসের খেলা শুরু: দেখুন সরাসরি (LIVE)
- রাজশাহী বনাম নোয়াখালীর শ্বাসরুদ্ধ ম্যাচটি শেষ-জানুন ফলাফল
- নোয়াখালী বনাম চট্টগ্রাম: জমজমাট ম্যাচটি শেষ-জেনে নিন ফলাফল
- চলছে সিলেট বনাম নোয়াখালীর ম্যাচ: দেখুন সরাসরি (LIVE)
- রংপুর রাইডার্স বনাম চট্টগ্রাম রয়্যালস: খেলাটি সরাসরি দেখুন (LIVE)
- ঢাকা ক্যাপিটালস বনাম রাজশাহী ওয়ারিয়র্স: খেলাটি সরাসরি দেখুন (LIVE)
- রাজশাহী ওয়ারিয়র্স বনাম রংপুর রাইডার্স: খেলাটি সরাসরি দেখুন (LIVE)
- দুবাই ক্যাপিটালস বনাম এমআই ইমিরেটস-খেলাটি সরাসরি দেখুন (LIVE)
- ঢাকা ক্যাপিটালস বনাম সিলেট টাইটান্স: খেলাটি সরাসরি দেখুন (LIVE)
- রংপুর বনাম চট্টগ্রামের জমজমাট ম্যাচটি শেষ: জেনে নিন ফলাফল
- আজ থেকে টানা ৫ দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস
- ঢাকা বনাম রাজশাহীর ম্যাচ চলছে: ব্যাটিংয়ে ক্যাপিটালস, দেখুন সরাসরি
- ঢাকা ক্যাপিটালস বনাম রাজশাহী ওয়ারিয়র্স: রুদ্ধশ্বাস ম্যাচটি শেষ-দেখুন ফলাফল
- সিলেট টাইটান্স ও ঢাকা ক্যাপিটালসের খেলা শেষ-জেনে নিন ফলাফল
- চলছে ঢাকা বনাম চট্টগ্রামের ম্যাচ: খেলাটি সরাসরি দেখুন (LIVE)