ঢাকা, রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বাড়ছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ঝুঁকি
নিজস্ব প্রতিবেদক: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ও কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার পাশাপাশি দারিদ্র্য কমানোর অগ্রগতিও থমকে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে আশঙ্কা করা হয়েছে, যুদ্ধের প্রভাবে চলতি বছর প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে প্রায় ১২ লাখ মানুষের দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনাও নষ্ট হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সীমিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়া এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমানোর গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। শুধু ২০২৫ সালেই দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে।
চলতি বছর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু সংঘাতের কারণে সেই সংখ্যা কমে প্রায় ৫ লাখে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধের কারণে আরও প্রায় ১২ লাখ মানুষের দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, এ বছর দেশে দারিদ্র্য বাড়ার পেছনে মূল্যবৃদ্ধির ভূমিকা থাকবে প্রায় ১০ শতাংশ। জ্বালানির বাড়তি দাম ধাপে ধাপে ভোক্তার ওপর চাপানো হলে মূল্যস্ফীতি আরও শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। এতে পরিবহণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন নিম্ন আয়ের মানুষ।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন বাস্তবসম্মত। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো কমে গেছে। পাশাপাশি জ্বালানি সংকটের কারণে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। বরং উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদ্যমান কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়ছে।
তিনি বলেন, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এলএনজি আমদানিতে বিকল্প উৎস খোঁজার পাশাপাশি বিদ্যমান সমস্যাগুলো অগ্রাধিকার দিয়ে সমাধান করতে হবে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব না হলেও অন্তত বিদ্যমান কর্মসংস্থান ধরে রাখা যাবে। দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ কমাতে ওএমএসের পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ডের আওতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জ্বালানির অভাবে অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি যেমন কঠিন, তেমনি যারা বর্তমানে কর্মরত আছেন, তাঁদের ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। ইতোমধ্যে কর্মহানি শুরু হয়েছে এবং পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে তা আরও বাড়তে পারে।
জ্বালানিতে বড় ঝুঁকি
বিশ্বব্যাংকের মতে, এলএনজির ওপর বাংলাদেশের অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের জ্বালানি খাতে বড় কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি করেছে। দেশে গ্যাসের উৎপাদন ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় ১৫ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে ওই অঞ্চলে সংঘাত বা সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশ সরাসরি ঝুঁকিতে পড়ে।
যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামও বেড়েছে। স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ২৪ থেকে ২৮ ডলারে উঠেছে, যা আগের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। একই সময়ে পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির পাঁচটিকে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে।
জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব পড়ছে সরকারের ওপরও। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি জিডিপির ২ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে। সব মিলিয়ে ভর্তুকির চাপ ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন থেকে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। এতে সামাজিক নিরাপত্তাসহ অন্য খাতে সরকারি ব্যয় কমানোর ঝুঁকি রয়েছে।
কৃষি ও স্বাস্থ্যেও চাপ
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ছে কৃষিতে। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। সার উৎপাদনেও গ্যাসের প্রয়োজন হয়। এরই মধ্যে ছয়টি ইউরিয়া কারখানার পাঁচটিকে গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। ইউরিয়ার দামও বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। সংকট দীর্ঘ হলে সারের দাম দ্বিগুণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। এতে কৃষকের আয় ও খাদ্যনিরাপত্তা উভয়ই ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
স্বাস্থ্য খাতও এর বাইরে নয়। বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতির কারণে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে, ফলে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়। আবার ওষুধ তৈরির কাঁচামাল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের বড় অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় সংকট তৈরি হলে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ও বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু জ্বালানি সংকটের বিষয় নয়। এর প্রভাব কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য, কৃষি, শিল্প উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা, মূল্যস্ফীতি ও সরকারি ব্যয়সহ অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই পড়তে পারে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এসব চাপ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইমামুল
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- BANZI নির্বাচন: জয়-পরাজয়ের বাইরে কমিউনিটির আমানত ও প্রত্যাশা
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (২৫ আগস্ট) r
- ৭ কলেজের শিক্ষার্থীদের ডিসিইউতে স্থানান্তরের রোডম্যাপ প্রকাশ
- প্রজ্ঞাপনের আগে পে স্কেলের বেতন তালিকা
- তেজগাঁও কলেজে মঞ্চে উঠছে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’
- জামায়াতের ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠন, প্রধানমন্ত্রী ডা. শফিকুর রহমান
- মেহেরপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়োগ
- ৬০ লাখ বাংলাদেশির সিভি ডার্ক ওয়েবে বিক্রির দাবি
- আজকের নামাজের সময়সূচি
- বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে দুই পদে চাকরির সুযোগ
- বাসায় ঢুকে মডেলকে কুপিয়ে হ'ত্যা
- ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার তারিখ জানাল শিক্ষা মন্ত্রণালয়
- টাকার বিনিময়ে ১২০০ শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন
- জাতীয় কবির ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ঢাবির কর্মসূচি
- বোর্ড সচিব বাবা, টেনেটুনে পাস করা ছেলের ফল জিপিএ-৫