ঢাকা, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩

হাঁটতেই বেশি সময় কাটান মেসি, তবু বদলে দেন ম্যাচের ভাগ্য

২০২৬ জুলাই ১২ ১৬:২৪:৫৩

হাঁটতেই বেশি সময় কাটান মেসি, তবু বদলে দেন ম্যাচের ভাগ্য

স্পোর্টস ডেস্ক: মাঠে লিওনেল মেসিকে বেশির ভাগ সময়ই হাঁটতে দেখা যায়। চলমান বিশ্বকাপেও একই চিত্র। দেখে মনে হতে পারে, তিনি যেন দৌড়ের বদলে প্রাতঃভ্রমণেই ব্যস্ত। অথচ সেই ধীরস্থির উপস্থিতিই মুহূর্তে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে। পরিসংখ্যানও বলছে, এ পর্যন্ত মাঠে কাটানো সময়ের ৬৩ শতাংশই তিনি হাঁটতে বা দাঁড়িয়ে থেকে কাটিয়েছেন।

৩৯ বছর বয়সী মেসি কি বয়সের কারণে আগের মতো দৌড়াতে পারছেন না-এমন প্রশ্ন উঠছে অনেকের মনে। তবে ফিফার পরিসংখ্যান ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত তিনি মোট ৩৫ দশমিক ৮৭১ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছেন। এর মধ্যে ২২ দশমিক ৯৬০ কিলোমিটার পথ তিনি ঘণ্টায় শূন্য থেকে সাত কিলোমিটার গতিতে চলেছেন, অর্থাৎ বেশির ভাগ সময়ই হাঁটছেন কিংবা স্থির অবস্থানে ছিলেন।

মিশরের বিপক্ষে ০-২ গোলে পিছিয়ে পড়ার পরও আর্জেন্টিনা ৩-২ ব্যবধানে জয় পায়। সেই ম্যাচেও মেসিকে খুব বেশি পরিশ্রম করতে দেখা যায়নি। তবে মাত্র ১৩ মিনিটের কার্যকর খেলায় তিনি ম্যাচের চিত্র পাল্টে দেন। দক্ষতা ও প্রতিভার সর্বোচ্চ ব্যবহারেই পার্থক্য গড়ে দেন তিনি।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মেসি ম্যাচের ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশ সময় মাঝমাঠে অবস্থান করেন। এর মধ্যে ২৩ শতাংশ সময় তিনি কেবল দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং ৮ দশমিক ৬ শতাংশ সময় হালকা জগিং করেছেন।

আর্জেন্টিনার কোচ লিয়োনেল স্কালোনি মেসিকে কিছুটা পেছন থেকে খেলাচ্ছেন, যাতে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের চাপ কম পড়ে। একই সঙ্গে মেসিও প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি জানেন, মাঠের যেখানেই থাকুন না কেন, প্রতিপক্ষের অন্তত দুজন ফুটবলার তাকে ঘিরে রাখার চেষ্টা করবে। ফলে তার সতীর্থরা তুলনামূলক বেশি ফাঁকা জায়গা পান।

মেসির বিচরণ মূলত মাঝমাঠ থেকে প্রতিপক্ষের বক্সের সামনের অংশ পর্যন্ত, বিশেষ করে মাঠের ডান দিকে। এই জায়গাটিকেই নিজের সবচেয়ে কার্যকর অঞ্চল হিসেবে ব্যবহার করেন তিনি। বল পেলে ছোট ছোট স্পর্শ কিংবা শরীরের সূক্ষ্ম মোচড়ে ডিফেন্ডারদের ছিটকে দিয়ে রক্ষণভাগে ভাঙন ধরান। কখনো নিজেই গোল করেন, আবার কখনো সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা সতীর্থকে বল বাড়িয়ে দেন। রাউন্ড অব ১৬ পর্যন্ত নিজের পছন্দের এই অঞ্চলে ৯৭ বার বল পেয়েছেন তিনি।

প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার কৌশলেও রয়েছে বৈচিত্র্য। কাবো ভার্দের বিপক্ষে এক আক্রমণে ডান দিক দিয়ে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে প্রতিপক্ষের প্রায় পুরো রক্ষণকে ওই দিকে টেনে আনেন। এরপর হঠাৎ বাঁ দিকে সরে জায়গা তৈরি করে নিজের শক্তিশালী বাঁ পায়ে শট নেন।

ফ্রান্সের সাবেক ডিফেন্ডার রাফায়েল ভারানে, যিনি মেসির বিপক্ষে ২১টি ম্যাচ খেলেছেন এবং ২০২২ বিশ্বকাপেও মুখোমুখি হয়েছেন, বলেছেন, “মেসির একটা বিশেষত্ব রয়েছে। ও মাঠের এমন সব জায়গায় ঘুরে বেড়ায়, কিছু বোঝা যায় না। ডিফেন্ডারেরা বুঝতেই পারে না কার ওকে আটকানো উচিত। মিডফিল্ডার, সেন্টার ব্যাক আর ফুল ব্যাকের মধ্যে একটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়। মেসির এই অফ দ্য বল খেলাটা অত্যন্ত বিপজ্জনক।”

ভারানে আরও বলেন, মেসি কখনোই অতিরিক্ত পরিশ্রম করে খেলেন না। বরং তার ফুটবল-চিন্তা ও ম্যাচ পড়ার ক্ষমতাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, মাঠে মেসির গতিবিধি অনুমান করা অত্যন্ত কঠিন। একই ধরনের আক্রমণেও তার অবস্থান ভিন্ন হতে পারে, যা অনেক সময় সতীর্থদের কাছেও অপ্রত্যাশিত থাকে। তিনি যেমন নিজের জন্য জায়গা তৈরি করেন, তেমনি সতীর্থদের জন্যও সুযোগ সৃষ্টি করেন। অনেক আক্রমণে তিনি বক্সের বাইরে অবস্থান করেন, যাতে প্রতিপক্ষ গোলমুখে অতিরিক্ত ভিড় করতে না পারে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার প্রথম গোলটি এসেছিল এমনই একটি পরিস্থিতি থেকে।

মেসির সাবেক কোচ পেপ গার্দিওলা বলেছেন, “মাঠে মেসিকে অধিকাংশ সময় দেখে অলস মনে হয়। হয়তো ও-ই সবচেয়ে কম দৌড়ায়। কিন্তু পায়ে বল পেলেই মুহূর্তে গোটা মাঠটা জরিপ করে নেয়। কে কোথায় আছে, কার কাছে বল পৌঁছাতে কত সময় লাগতে পারে-সবকিছুর নিখুঁত হিসাব করে নেয়। তারপরই আসল কাজটা করে ফেলে।”

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আর্জেন্টিনার আক্রমণে মেসির ৭১ শতাংশ দৌড় শেষ হয় বক্সের মাথায়। বাকি ২৯ শতাংশ ক্ষেত্রে তিনি বক্সে প্রবেশ করেন। ২০২২ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার সহকারী কোচ রেনে মিউলেনস্টিন বলেন, “আগের বিশ্বকাপে আমাদের বিরুদ্ধে ম্যাচটায় ৮০ শতাংশ সময় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়িয়েছিল মেসি। ও ঠিক তখনই সক্রিয় হয়ে ওঠে, যখন বুঝতে পারে ইতিবাচক কিছু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কখন সক্রিয় হবে, এটা শুধু মেসিই জানে।”

তিনি উদাহরণ হিসেবে কাবো ভার্দের বিপক্ষে একটি মুহূর্তের কথা উল্লেখ করেন। বক্সের আগ পর্যন্ত ধীরগতিতে এগিয়ে এসে হঠাৎ গতি বাড়িয়ে কাবো ভার্দের মিডফিল্ডার কেভিন পিনাকে ছিটকে দেন এবং জায়গা তৈরি করে গোলের উদ্দেশে শট নেন।

আর্সেনালের সাবেক ডিফেন্ডার উইলিয়াম গালাস, যিনি তরুণ মেসির বিপক্ষে একাধিকবার খেলেছেন, বলেন, “মেসি হাঁটলে বা দাঁড়িয়ে থাকলেও কোনো ডিফেন্ডার চাইবে না, ও বল পাক। তাই ওর কাছাকাছি থাকতেই হবে। আর ওর কাছে থাকা মানেই ফাঁদে পা দেওয়া। কাছে না গেলে তো আটকানোর সুযোগই থাকবে না। নিজের বা কোনো সতীর্থের জন্য সুযোগ তৈরি করতে চায় মেসি। আসলে কী করতে চাইছে, তা বোঝা যায় না।”

বিশ্বকাপে এবারও মেসির ৬৩ শতাংশ সময় হাঁটা বা দাঁড়িয়ে কাটানো তাই ফুটবল বিশেষজ্ঞদের কাছে বিস্ময়ের নয়। ছোটবেলা থেকেই তিনি এমনই। অসাধারণ ফুটবল-প্রজ্ঞা ও ম্যাচ পড়ার অনন্য ক্ষমতাই তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলায় পরিণত করেছে। মাঠে কম দৌড়েও আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ী অধিনায়ক বারবার প্রমাণ করছেন, ফুটবলে শুধু গতি নয়, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তই সবচেয়ে বড় শক্তি।

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (১১ জুলাই)

আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (১১ জুলাই)

নিজস্ব প্রতিবেদক: স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেশে ফের বাড়ানো হয়েছে স্বর্ণের দাম। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন... বিস্তারিত