ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রির মূল্য নিয়ে আস্থা হারাচ্ছে মানুষ

২০২৬ জুন ০২ ১৮:৪১:০৯

বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রির মূল্য নিয়ে আস্থা হারাচ্ছে মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি একসময় ভালো চাকরি ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ হিসেবে বিবেচিত হতো। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ধারণায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, ছাত্রঋণের চাপ এবং চাকরির বাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেকেই এখন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার প্রকৃত মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে উচ্চশিক্ষা খাতের বিস্তারের পর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার প্রতি জনআস্থায় উল্লেখযোগ্য ভাটা পড়েছে। সর্বশেষ ব্রিটিশ সোশ্যাল অ্যাটিটিউডস (বিএসএ) জরিপে দেখা গেছে, যারা মনে করেন একটি ডিগ্রি অর্জনের জন্য সময় ও অর্থ ব্যয় করা সার্থক নয়, তাদের হার ২০০৫ সালের ১৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে। একইভাবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা ব্যক্তিরা অন্যদের তুলনায় আর্থিকভাবে অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন এমন বিশ্বাসীদের হার ৫০ শতাংশ থেকে কমে ৩৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

১৯৮৩ সালে প্রথম বিএসএ জরিপ পরিচালনার পর যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। সে সময় স্কুল শেষ করা শিক্ষার্থীদের মাত্র ৬ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে যেত। ২০২৫ সালে এই হার বেড়ে ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং দেশটিতে ২০ লাখেরও বেশি স্থানীয় শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে।

এর ফলে চাকরির বাজারে স্নাতকদের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে তাদের শিক্ষার খরচও। ১৯৯৮ সালে টিউশন ফি চালু হওয়ার সময় বছরে ১ হাজার পাউন্ড নির্ধারণ করা হয়েছিল। বর্তমানে ইংল্যান্ডে শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের পাশাপাশি বছরে সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৫৩৫ পাউন্ড পর্যন্ত টিউশন ফি দিতে হচ্ছে।

জরিপে দেখা গেছে, যারা টিউশন ফি ও ঋণের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তারা পূর্ববর্তী প্রজন্মের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা নিয়ে বেশি হতাশ।

অন্যদিকে, ছাত্রঋণ পরিশোধ শুরু করার জন্য নির্ধারিত আয়ের সীমা মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা একাধিকবার স্থির রাখা হয়েছে। ২০২৭ সাল থেকে এই সীমা আরও তিন বছর অপরিবর্তিত থাকবে।

ছাত্রঋণের ওপর মুদ্রাস্ফীতির চেয়েও বেশি সুদ আরোপ করা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকের মতে, এতে স্নাতকদের আর্থিক চাপ অতিরিক্ত মাত্রায় পৌঁছে যাচ্ছে।

ইউনিভার্সিটিজ ইউকের প্রধান নির্বাহী ভিভিয়েন স্টার্ন বলেন, শুধু স্নাতকদের জন্য নয়, বর্তমানে চাকরি খুঁজছেন এমন সবার জন্যই শ্রমবাজার কঠিন হয়ে উঠেছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থার প্রতিফলন।

তবে তিনি উল্লেখ করেন, বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত এখনো দেখায় যে ডিগ্রিধারীদের চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তাদের আয় তুলনামূলক বেশি হয় এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থাও সাধারণত ভালো থাকে। পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও উচ্চশিক্ষিত জনশক্তির প্রয়োজন রয়েছে।

হায়ার এডুকেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের পরিচালক নিক হিলম্যানও একই মত পোষণ করেন। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা এখনো অধিকাংশ স্নাতকের জন্য লাভজনক হলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত মাত্রায় না হওয়ায় এর সুফল অনেক সময় মানুষের প্রত্যাশার তুলনায় কম মনে হয়। তবুও বর্তমানে প্রতি তিনজনের মধ্যে মাত্র একজন মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা লাভজনক নয়।

ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপ সত্ত্বেও ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব স্টুডেন্টসের উচ্চশিক্ষাবিষয়ক সহ-সভাপতি অ্যালেক্স স্ট্যানলি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অভিজ্ঞতাকে ইতিবাচকভাবে দেখেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়লে তিনি বর্তমান অবস্থানে পৌঁছাতে পারতেন না। ডিগ্রির পাশাপাশি অর্জিত অভিজ্ঞতাও তার কাছে সমান মূল্যবান।

তবে তিনি জানান, পড়াশোনার খরচ মেটাতে তাকে একসঙ্গে তিনটি চাকরি করতে হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে তার ফলাফলে। নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করলেও তার দেনার পরিমাণ ৫০ হাজার পাউন্ডের বেশি এবং তা এখনো বাড়ছে। তার মতে, বর্তমান অর্থায়ন ব্যবস্থা কার্যকর নয় এবং এটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গা হওয়া উচিত, যেখানে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান ও চিন্তার পরিধি বাড়ানোর সুযোগ পাবে এবং পড়াশোনা শেষে এমন যোগ্যতা অর্জন করবে যা তাদের কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই আদর্শ থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছে।

বিএসএ প্রতিবেদনের সহলেখক অ্যালেক্স শোলস বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি সামাজিক অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। তবে প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে তীব্র আর্থিক চাপের মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে ছাত্রঋণের ন্যায্যতা ও চাকরির বাজারে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে চলমান বিতর্ক মানুষের কাছে ডিগ্রির মূল্য সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

তার মতে, যদি উচ্চশিক্ষার প্রতি জনগণের আস্থা আরও কমতে থাকে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় খাতের বিদ্যমান আর্থিক সংকট আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

দেশের বাজারে কমল সোনার দাম, ভরি কত?

দেশের বাজারে কমল সোনার দাম, ভরি কত?

নিজস্ব প্রতিবেদক: সোনাপ্রেমীদের জন্য স্বস্তির খবর। দেশের বাজারে আবারও কমানো হয়েছে সোনার দাম। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ... বিস্তারিত