ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
আগের গণভোটের পর নতুন গণভোট কেন, উঠছে সাংবিধানিক প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক: জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণের দেওয়া রায়ের পর আবারও গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব ঘিরে নতুন সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির নতুন গণভোটের প্রস্তাবের পর প্রশ্ন উঠেছে, দ্বিতীয়বার গণভোট হলে আগের গণভোটের রায়ের অবস্থান কী হবে। সংবিধান সংস্কার নাকি সংশোধন—এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী জোটের মতপার্থক্যের মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া নতুন গণভোটের উদ্যোগকে স্ববিরোধী বলে মনে করছেন। তবে আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের মতে, বর্তমান সংবিধানে গণভোটের বিধানই পুরোপুরি কার্যকর নেই। ফলে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি সাংবিধানিক ব্যাখ্যা নিয়েও নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে।
সংবিধান সংস্কার নাকি সংশোধন—এই বিরোধ এখন সংসদের সীমানা ছাড়িয়ে সাংবিধানিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা থাকলেও ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদ সদস্যরা ওই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের এমপিরা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন। এ অবস্থানের পার্থক্যের কারণে সংসদে গঠিত সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির কার্যক্রম প্রত্যাখ্যান করেছে বিরোধী দল।
বিরোধী দলের আপত্তি থাকলেও বিশেষ কমিটির কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। গত রবিবার গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, আগামী বছরের জানুয়ারিতে সংসদে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপন করা হতে পারে। ওই বিলে সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের প্রস্তাব থাকবে। সংসদে বিলটি পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের আগে গণভোট আয়োজন করা হবে বলেও জানান তিনি।
বিশেষ কমিটির এ অবস্থানের পরই আগের গণভোটের রায় নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংবিধান সংস্কারের পক্ষে জনগণ ইতিমধ্যে গণভোটে মত দেওয়ার পর নতুন করে গণভোটের প্রয়োজন কেন—সে প্রশ্ন তুলছেন আইনজ্ঞরা। তাঁদের আরও প্রশ্ন, দ্বিতীয় গণভোট হলে প্রথম গণভোটের সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক অবস্থান কী হবে এবং প্রথম রায় বাস্তবায়নের আগেই নতুন গণভোটের উদ্যোগ কতটা যুক্তিসংগত।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেছেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে ১৪২ অনুচ্ছেদের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হলে গণভোটের প্রয়োজন রয়েছে। তবে জুলাই সনদ নিয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণের দেওয়া রায়কে অস্বীকার করে আবার গণভোটের উদ্যোগ নেওয়া হলে সেটি স্ববিরোধী হবে বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, দেশে ইতিমধ্যে একটি বড় সাংবিধানিক পরিবর্তন ঘটেছে। সরকার পরিবর্তন ও সাংবিধানিক সংকটের প্রেক্ষাপটে জনগণ তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটে অংশ নিয়েছে। সেই গণভোটে সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়ার পাশাপাশি সংস্কার কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়েও জনগণের মতামত নেওয়া হয়েছে।
শরীফ ভূঁইয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং ভোটাভুটির প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছিল। তাঁর মতে, ওই আদেশ ও গণভোটের রায়কে পাশ কাটিয়ে পুরোনো পদ্ধতিতে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা জনগণের রায়ের প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এই আইনজীবীর অভিযোগ, বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে এবং গণভোটের সিদ্ধান্ত অনুসরণ না করে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংশোধনের পথে যাচ্ছে। তাঁর মতে, এই পদ্ধতিতে সংস্কার করতে হলে সংসদকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং সংশোধনী পাসের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে সংবিধানের নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে গণভোট আয়োজনের বাধ্যবাধকতাও তৈরি হবে।
সংবিধানকে শুধু আইনগত দলিল হিসেবে দেখার পক্ষে নন শরীফ ভূঁইয়া। তাঁর মতে, এটি একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক দলিল। তাই সংবিধানের মতো মৌলিক বিষয়ে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে পরিবর্তনের বৈধতা ও জনগ্রহণযোগ্যতা আরও শক্তিশালী হয়।
অতীতের উদাহরণ টেনে শরীফ ভূঁইয়া বলেন, একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধনের প্রভাব দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর পড়েছে। আওয়ামী লীগের পঞ্চদশ সংশোধনী এবং তার আগে চতুর্থ সংশোধনীর উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, জনগণের দাবি ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ উপেক্ষা করে সংবিধান পরিবর্তনের পরিণতি অতীতে দেখা গেছে। বিএনপির ক্ষেত্রেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালুর মতো জনদাবি উপেক্ষিত হওয়ার নজির রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে গণভোটের সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়েই ভিন্ন প্রশ্ন তুলেছেন সুপ্রিম কোর্টের আরেক সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গণভোটের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সেটিকে তিনি মনগড়া এবং সংবিধানের ভুল ব্যাখ্যা বলে মনে করেন। তাঁর মতে, পঞ্চম সংশোধনী ও পঞ্চদশ সংশোধনী-সংক্রান্ত মামলার রায় এবং পঞ্চদশ সংশোধনীকে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে বিষয়টির প্রকৃত সাংবিধানিক অবস্থান স্পষ্ট হবে।
শিশির মনিরের বক্তব্য, সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে সংবিধান সংশোধন করা যায়। তবে বর্তমান সংবিধানের বিধান অনুযায়ী গণভোট আয়োজন বাধ্যতামূলক—এমন ব্যাখ্যা সঠিক নয় বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, ১৪২ অনুচ্ছেদ সুপ্রিম কোর্টের রায়ে পুনর্বহাল হলেও গণভোটের বিধান পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। এটি কার্যকর করতে হলে পৃথক সংশোধনীর মাধ্যমে ১৪২ অনুচ্ছেদকে নতুন করে সংবিধানে যুক্ত করতে হবে।
এদিকে বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সুপ্রিম কোর্টের রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হওয়ায় সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এর ফলে সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং ৮, ৪৮, ৫৬ ও ১৪২ অনুচ্ছেদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধানে পরিবর্তন আনতে হলে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে জনগণের সরাসরি মতামত নিতে হবে।
১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে গণভোটের বিধান যুক্ত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে ওই বিধানের আওতায় সংবিধানের প্রস্তাবনা ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু অনুচ্ছেদ সংশোধনের ক্ষেত্রে সংসদে বিল পাসের পর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের আগে গণভোটের ব্যবস্থা ছিল। তবে ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে গণভোটের বিধান বাদ দেওয়া হয়। পরে হাইকোর্টের রায়ে তা পুনর্বহাল হয় এবং গত জুলাইয়ে আপিল বিভাগও সেই রায় বহাল রাখেন।
এখন সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধটি শুধু আইনি ব্যাখ্যার প্রশ্নে সীমিত নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গণভোটের রায়, জনগণের সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের বিষয়ও। সরকার প্রচলিত সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে সংশোধনের পথে এগোতে চাইছে, আর বিরোধী জোট চাইছে গণভোটে অনুমোদিত সংস্কার প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন। সংশ্লিষ্টদের মতে, দুই অবস্থানের দূরত্ব কমানো না গেলে নতুন গণভোটের প্রস্তাব সাংবিধানিক জটিলতা দূর করার পরিবর্তে বিতর্ক আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ইমামুল
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া ম্যাচ কখন, কোথায় দেখবেন সরাসরি
- বাংলাদেশ বনাম মালয়েশিয়া ম্যাচ: Live দেখুন এখানে
- না ফেরার দেশে চলে গেলেন জেমস
- আকিজ গ্রুপে চাকরি, আবেদন ৯ অক্টোবর পর্যন্ত
- ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির নতুন উপাচার্যকে প্রত্যাখ্যান শিক্ষার্থীদের
- ঢাবির শহীদুল্লাহ্ হলের শিক্ষার্থী মুরাদের আকস্মিক মৃ/ত্যু
- প্রাথমিকে ১৪ হাজার শিক্ষকের নিয়োগপত্র, যোগদান ও পদায়নের সূচি প্রকাশ
- কোন রুটে কত বাড়ল বাসের ভাড়া
- আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের ৭৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (২৪ সেপ্টেম্বর)
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (২৫ সেপ্টেম্বর)
- ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির নতুন উপাচার্য অধ্যাপক লুৎফর রহমান
- বাস ভাড়া বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি
- ইবনে সিনা ট্রাস্টে মেডিকেল অফিসার নিয়োগ, আবেদন অনলাইনে
- ডিসেম্বরে দেশে ফেরা নিয়ে নতুন ঘোষণা হাসিনার