ঢাকা, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ক্যাপাসিটি চার্জের বকেয়া নিয়ে আইনি পদক্ষেপ ভাবছে সরকার

২০২৬ জুন ১২ ২০:৩৩:২২

ক্যাপাসিটি চার্জের বকেয়া নিয়ে আইনি পদক্ষেপ ভাবছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক: আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে করা চুক্তির আওতায় জমে থাকা ক্যাপাসিটি চার্জের বকেয়া নিয়ে আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু শুক্রবার (১২ জুন) ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান। তবে কার বিরুদ্ধে বা কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।

মন্ত্রী বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জ সংক্রান্ত বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ব্যাপারে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে। ইতিবাচক মতামত পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বিদ্যুৎ খাতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার চুক্তিগুলোতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেন টুকু। তিনি বলেন, এসব চুক্তির কারণে সরকারকে বড় ধরনের আর্থিক ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

মন্ত্রী বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা যাতে সহজে ব্যাংক ঋণ পেতে পারেন, সে উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জ চালু করা হয়েছিল। তার ভাষায়, আগের সরকার বিনিয়োগকারীদের সুবিধা নিশ্চিত করতে এমন চুক্তি করেছে, যেখানে সরকারের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে।

ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই কাজ শুরু করেছেন বলে দাবি করেন টুকু। তিনি বলেন, মন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই এ বিষয়ে তিনি আলোচনা শুরু করেন। চীনা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠকে তারা জানান, হঠাৎ করে ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ করা হলে অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়বে।

২০০৯ সালে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৬ হাজার মেগাওয়াটেরও কম। ওই সময় আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে দায়মুক্তি আইন প্রণয়ন করে এবং দরপত্র ছাড়াই শতাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে, যার বেশির ভাগই ছিল বেসরকারি বিনিয়োগে।

বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে ক্যাপাসিটি চার্জ চালুর ফলে বিনিয়োগকারীদের সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফার সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে থাকুক বা না থাকুক, নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে সরকারকে।

শুধু শীতকাল নয়, গরমের সময়ও বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকায় অনেক কেন্দ্র অলস পড়ে থাকে। তবুও এসব কেন্দ্রকে অর্থ প্রদান করতে হয়। এছাড়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকট তৈরি হলে অনেক কেন্দ্র ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির থাকায় অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদনে যেতে পারেনি। পরবর্তীতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি আমদানিও কঠিন হয়ে পড়ে।

অনেকের মতে, অর্থপাচার এবং এলএনজি আমদানির ব্যয় মেটানোর কারণেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমতে থাকে। পাশাপাশি ক্যাপাসিটি চার্জের একটি বড় অংশ ডলারে পরিশোধ করতে হয়েছে সরকারকে।

সরকারি হিসাবে, ২০০৯ সালের পরবর্তী ১৪ বছরে বাংলাদেশকে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ প্রায় এক লাখ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। এখনো বিপুল পরিমাণ অর্থ বকেয়া রয়েছে। তবে জোর করে ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ করলে বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকট দেখা দিতে পারে বলে মনে করেন মন্ত্রী।

তিনি বলেন, দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অনেকগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণও করা হয়নি। অধিকাংশ বিদ্যুৎ বেসরকারি খাত থেকে কেনা হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়া সৃষ্টি হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও অপচয়ের অভিযোগ তুলে মন্ত্রী বলেন, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ৫ লাখ ডিজিটাল মিটার কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এর মধ্যে আনা ২ লাখ ৫০ হাজার মিটারের মাত্র ৬৫টি তিন বছরে চালু করা সম্ভব হয়েছে। বাকিগুলো গুদামে পড়ে রয়েছে। পরবর্তী চালান বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার পর দেখা যায়, সরবরাহকারীর কাছে আগেই জাহাজীকরণের নির্দেশ পাঠানো হয়েছে। ফলে চুক্তি বাতিল করলে আইনি জটিলতায় পড়তে হতে পারে।

ডিপিডিসির আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল প্রকল্প নিয়েও সমালোচনা করেন টুকু। তিনি জানান, ২০৪০ সাল পর্যন্ত উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৬৫টি সাবস্টেশন নির্মাণের লক্ষ্য থাকলেও প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে মাত্র ৩৮টির কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত