ঢাকা, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩
ফোবিয়া কী, সাধারণ ভয় থেকে পার্থক্য বুঝবেন যেভাবে
ডুয়া ডেস্ক: সাপ, মাকড়সা, অন্ধকার কিংবা উঁচু জায়গা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভয় পাওয়া মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা। তবে কোনো নির্দিষ্ট বস্তু বা পরিস্থিতির প্রতি ভয় অতিরিক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠলে এবং তা দৈনন্দিন জীবনযাপনে বাধা সৃষ্টি করলে সেটি ফোবিয়া হতে পারে। সাধারণ ভয় ও ফোবিয়ার মধ্যে পার্থক্য কোথায়, আর কীভাবে বুঝবেন আপনি ফোবিয়ায় আক্রান্ত কি না?
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথের (এনআইএমএইচ) তথ্য অনুযায়ী, ফোবিয়া হলো নির্দিষ্ট কোনো বস্তু বা পরিস্থিতির প্রতি তীব্র ভয় কিংবা বিরূপ প্রতিক্রিয়া। বাস্তবে কোনো বিষয় যতটা বিপজ্জনক, ফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে সেটি তার চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক বলে মনে হয়।
ভয় মানুষের স্বাভাবিক আবেগ। বিপদের সময় এই অনুভূতি মানুষকে সতর্ক করে এবং আত্মরক্ষায় সাহায্য করে। কিন্তু ভয় যখন অযৌক্তিক ও অতিরিক্ত হয়ে যায় এবং এর কারণে কেউ নিয়মিত নির্দিষ্ট পরিস্থিতি এড়িয়ে চলেন, তখন তা ফোবিয়ার লক্ষণ হতে পারে।
ফোবিয়া কত ধরনের
ফোবিয়া ও ফোবিয়াসংশ্লিষ্ট সমস্যার কয়েকটি ধরন রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো স্পেসিফিক ফোবিয়া, অ্যাগোরাফোবিয়া ও সোশ্যাল অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার।
স্পেসিফিক ফোবিয়া: নির্দিষ্ট কোনো বস্তু বা পরিস্থিতির প্রতি তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী ভয়কে স্পেসিফিক ফোবিয়া বলা হয়। এটি কখনো কখনো সিম্পল ফোবিয়া নামেও পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের ফোবিয়ায় ভয়ের মাত্রা বাস্তব বিপদের তুলনায় অনেক বেশি থাকে।
সাপ, কুকুর, পোকামাকড়, উঁচু জায়গা, বিমানযাত্রা, বদ্ধ স্থান, রক্ত কিংবা সুচের প্রতি তীব্র ভয় স্পেসিফিক ফোবিয়ার অন্তর্ভুক্ত।
অ্যাগোরাফোবিয়া: এ সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা একাধিক পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ভয় অনুভব করেন। যেমন গণপরিবহনে চলাচল, খোলা বা বদ্ধ জায়গায় অবস্থান, জনসমাগমে থাকা, লাইনে দাঁড়ানো কিংবা বাড়ির বাইরে একা যাওয়া।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে অসুস্থ বোধ করলে সেখান থেকে বের হতে পারবেন না কিংবা প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবেন না এমন আশঙ্কা তাঁদের মধ্যে কাজ করে। সমস্যা গুরুতর হলে কেউ কেউ বাড়ির বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দিতে পারেন।
সোশ্যাল অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার: আগে এ সমস্যাকে সোশ্যাল ফোবিয়া বলা হতো। এতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সামাজিক পরিস্থিতিতে অন্যের নেতিবাচক মূল্যায়ন, সমালোচনা কিংবা বিব্রতকর অবস্থায় পড়ার আশঙ্কায় তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী ভয় অনুভব করেন।
সাধারণ ভয় ও ফোবিয়ার পার্থক্য বুঝবেন যেভাবে
পরীক্ষার আগে উদ্বিগ্ন হওয়া কিংবা অনেক মানুষের সামনে কথা বলতে গিয়ে অস্বস্তি বোধ করা স্বাভাবিক। তবে ফোবিয়ার ক্ষেত্রে ভয় দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তা ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবন, পড়াশোনা, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের তথ্য অনুযায়ী, স্পেসিফিক ফোবিয়া নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত অন্তত ছয় মাস ধরে ভয় বা সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার প্রবণতা রয়েছে কি না, তা বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি ভয়ের মাত্রার সঙ্গে বাস্তব বিপদের অসামঞ্জস্যও মূল্যায়ন করা হয়।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা এনএইচএস ফোবিয়ার কয়েকটি শারীরিক ও মানসিক লক্ষণের কথা জানিয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে-
তীব্র উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা।
মাথা ঘোরা বা মাথা হালকা লাগা।
হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া।
বুকে চাপ বা অস্বস্তি অনুভব করা।
বমি বমি ভাব, বমি বা ডায়রিয়া।
শরীর কাঁপা।
অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, নিয়ন্ত্রণ হারানো কিংবা মারা যাওয়ার তীব্র ভয়।
মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, নারীদের মধ্যে স্পেসিফিক ফোবিয়া তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে এ সমস্যা দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে পারে।
কেন তৈরি হয় ফোবিয়া
ফোবিয়া তৈরির সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা, মানসিক চাপ ও পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে বলে জানিয়েছে এনএইচএস।
শৈশবে কুকুরের তাড়া খাওয়া কিংবা কোনো প্রাণীর আক্রমণের শিকার হওয়ার পর সেই প্রাণীর প্রতি তীব্র ভয় তৈরি হতে পারে। আবার পরিবারের সদস্য বা বন্ধুকে কোনো বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত ভয় পেতে দেখলেও অন্যের মধ্যে একই ধরনের ভীতি তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া নিজের ভয় বা আতঙ্কের প্রতিক্রিয়া নিয়ে অন্যদের নেতিবাচক আচরণ, পরিবারে উদ্বেগজনিত সমস্যার ইতিহাস এবং শৈশবের মানসিক অভিজ্ঞতাও ফোবিয়া তৈরির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে ১০ বছর বয়সের আগেই স্পেসিফিক ফোবিয়া তৈরি হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে শিশুদের মধ্যে প্রায় ৩ থেকে ৯ শতাংশের স্পেসিফিক ফোবিয়া রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের মধ্যে এ হার প্রায় ১৬ শতাংশ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ সমস্যার হার কমতে দেখা যায়।
ফোবিয়া থেকে মুক্তির উপায়
ফোবিয়ার উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরে আসার জন্য বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা রয়েছে। এনএইচএসের পরামর্শ অনুযায়ী, এর অন্যতম হলো কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (সিবিটি)। এ ছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী হিপনোথেরাপি এবং চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
ফোবিয়ার ধরন ও তীব্রতা অনুযায়ী চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়। উপসর্গ সামলাতে নিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, বিশ্বাসযোগ্য মানুষের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া এবং একই ধরনের সমস্যায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলাও সহায়ক হতে পারে।
এ ছাড়া বিকেল তিনটার পর এনার্জি ড্রিংক ও ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে এনএইচএস। এসব পানীয় ঘুমে ব্যাঘাত ঘটানোর পাশাপাশি উদ্বেগ বাড়াতে পারে।
পরিচিত কিছু ফোবিয়ার নাম
যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, স্পেসিফিক ফোবিয়াকে সাধারণত পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে পরিচিত কয়েকটি হলো—
প্রাণীসংক্রান্ত ফোবিয়া
অ্যারাকনোফোবিয়া: মাকড়সার ভয়।
সাইনোফোবিয়া: কুকুরের ভয়।
এন্টোমোফোবিয়া: পোকামাকড়ের ভয়।
ওফিডিওফোবিয়া: সাপের ভয়।
প্রাকৃতিক পরিবেশসংক্রান্ত ফোবিয়া
অ্যাক্রোফোবিয়া: উঁচু জায়গার ভয়।
অ্যাকুয়াফোবিয়া: পানির ভয়।
অ্যাস্ট্রাফোবিয়া: বজ্রপাত ও বজ্রধ্বনির ভয়।
রক্ত, চিকিৎসা ও আঘাতসংক্রান্ত ফোবিয়া
অ্যালগোফোবিয়া: ব্যথার ভয়।
ডেন্টোফোবিয়া: দাঁতের চিকিৎসার ভয়।
হিমোফোবিয়া: রক্তের ভয়।
ট্রাইপ্যানোফোবিয়া: সুচের ভয়।
নির্দিষ্ট পরিস্থিতিসংক্রান্ত ফোবিয়া
অ্যারোফোবিয়া: বিমানে ভ্রমণের ভয়।
অ্যাম্যাক্সোফোবিয়া: গাড়ি চালানোর ভয়।
ক্লস্ট্রোফোবিয়া: বদ্ধ জায়গার ভয়।
নিক্টোফোবিয়া: অন্ধকারের ভয়।
অন্যান্য ফোবিয়া
কুলরোফোবিয়া: ক্লাউনের ভয়।
এমেটোফোবিয়া: বমি করার ভয়।
পাইরোফোবিয়া: আগুনের ভয়।
ট্রাইপোফোবিয়া: গুচ্ছ গুচ্ছ ছোট গর্ত বা ছিদ্রের বিন্যাস দেখে তীব্র ভয় বা অস্বস্তি।
ফোবিয়ার কারণে একজন মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও কর্মজীবন ব্যাহত হতে পারে। তাই কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে ভয় দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে, তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাধা সৃষ্টি করলে অবহেলা করা উচিত নয়। এমন পরিস্থিতিতে নিজের উপসর্গ ও অভিজ্ঞতা নিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই প্রয়োজন।
ইএইচপি
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার তারিখ জেনে নিন
- বাংলাদেশের জলবায়ু অগ্রাধিকার তুলে ধরতে তুরস্ক যাচ্ছে YFB-এর প্রতিনিধিদল
- মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেবে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (০৩ নভেম্বর)
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (০১ নভেম্বর)
- পুলিশের ৭৮ পরিদর্শক পদোন্নতি পেয়ে হলেন এএসপি
- বিশ্ববিদ্যালয়-মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা কি পেছাচ্ছে?
- সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার্থীদের ঢাবির ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিয়ে যা জানা গেল
- ঢাবির ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ
- যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণীর সঙ্গে যৌন বিকৃতির অভিযোগে সাবেক শিবির নেতা গ্রেপ্তার
- প্রবাসীর সন্তানেরা পাবে শিক্ষাবৃত্তি, জানুন আবেদন পদ্ধতি
- ফের স্বর্ণের দাম বেড়েছে, ভরিতে কত?
- কিউএসের এশিয়া র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের শীর্ষ ২০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ
- আজকের খেলার সময়সূচি (০১ নভেম্বর)
- ২০২৭ সালে সরকারি ছুটির তালিকা প্রকাশ