×

ঢাকা, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩

সাজেকে অবরোধ-সংঘাতের মধ্যে সংকট সমাধানে সংলাপের উদ্যোগ

২০২৬ অক্টোবর ২৫ ১৮:২৩:৪৪

সাজেকে অবরোধ-সংঘাতের মধ্যে সংকট সমাধানে সংলাপের উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে অবরোধ, সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। একদিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বন্ধ ও নিরাপত্তার দাবিতে স্থানীয় দুই সংগঠনের অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ, অন্যদিকে অবরোধ চলাকালে হামলার অভিযোগ এবং এর প্রতিবাদে কঠোর কর্মসূচি—সব মিলিয়ে অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পাহাড়জুড়ে।

বন্ধ রয়েছে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র। দোকানপাট ও যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটন ব্যবসায়ীরা। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

এ পরিস্থিতিতে সংকট নিরসনে সংলাপের উদ্যোগ নিয়েছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। এ লক্ষ্যে রোববার (২৫ অক্টোবর) জেলার হেডম্যান ও কারবারিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছে প্রশাসন। সভায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা করতে তিন সদস্যের একটি সংলাপ কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফীর সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া। বিশেষ অতিথি ছিলেন রাঙামাটির সংসদ সদস্য ও সাবেক পার্বত্যমন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। এ ছাড়া পুলিশ সুপার মুহম্মদ আবদুর রকিবসহ জেলার হেডম্যান, কারবারি, সামরিক, বেসামরিক ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সাজেকে চলমান আন্দোলন ও উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংলাপের জন্য গঠিত কমিটিতে রয়েছেন সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট ভবতোষ দেওয়ান, সাধারণ সম্পাদক শান্তি বিজয় চাকমা এবং সিএইচটি হেডম্যান অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জ্যোতির্ময় চাকমা কেরোল। কমিটিকে দ্রুত আলোচনা শুরু করার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে।

সভা শেষে আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, সাজেকের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি দ্রুত আন্দোলনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আলোচনার প্রস্তাব দেবে। এ প্রক্রিয়ায় বাঘাইছড়ির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান এবং খাগড়াছড়ির হেডম্যান-কারবারিদের প্রতিনিধিও যুক্ত থাকবেন। আন্দোলনকারীদের মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, সাজেকের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের নাম আসায় হেডম্যান ও কারবারিদের নিয়ে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্দোলন শুরুর পর থেকেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনায় বসার চেষ্টা চলছে। প্রথম দিন থেকেই গণমাধ্যমের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের আলোচনায় বসার আহ্বান জানানো হয়েছিল। তবে তখন আলোচনা শুরু করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে আন্দোলনকারীদের একটি বিবৃতিতে আলোচনায় বসার আগ্রহের বিষয়টি সামনে আসে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এতে সংলাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিরসনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সংলাপ কমিটির অন্যতম সদস্য অ্যাডভোকেট ভবতোষ দেওয়ান বলেন, তাঁরা দ্রুত আলোচনার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছেন। তাঁর আশা, আলোচনার মাধ্যমে চলমান সংকটের সমাধান হবে। এর মধ্য দিয়ে সাজেকে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসবে এবং দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রটি পর্যটকদের জন্য আবারও উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে।

এদিকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের অভিযোগ, সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় জনসংহতি সমিতির সন্তু লারমা-সমর্থিত সশস্ত্র সদস্যদের তৎপরতার কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। নিরীহ মানুষকে হুমকি দেওয়া বন্ধ, বাড়িঘরে তল্লাশির নামে হয়রানি বন্ধ এবং অভিযুক্ত সশস্ত্র সদস্যদের এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিতে তারা অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে সাজেকে তাদের কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে—এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে জনসংহতি সমিতি।

গত ২২ অক্টোবর উজোবাজার এলাকায় অবরোধকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। পরে সেখানে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। ওই ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকজন সদস্যসহ আন্দোলনকারীদের মধ্যে ৭০ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়। পরিস্থিতির মধ্যে আটকে পড়া প্রায় তিন হাজার পর্যটককে নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় খাগড়াছড়িতে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে ২৪ অক্টোবর রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের কর্মসূচি পালন করে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ।

পর্যটন ব্যবসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, অবরোধ ও পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় সাজেকের পর্যটন ব্যবসায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। রিসোর্ট ও কটেজের বুকিং বাতিল করতে হয়েছে। এতে পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তাঁদের মতে, প্রশাসনের সংলাপ উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, তার ওপর পরিস্থিতির উত্তরণ অনেকটাই নির্ভর করছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সব পক্ষের সঙ্গে কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে সংকটের স্থায়ী সমাধান জরুরি।

এ বিষয়ে সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা বলেন, সমস্যা সমাধানে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগের কথা তাঁরা কিছুটা শুনেছেন। প্রশাসন ইতিমধ্যে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আলোচনা করার কথা জানিয়েছে। তাঁরা একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য সমাধান চান।

নতুন জয় চাকমা আরও বলেন, তাঁরা বারবার প্রশাসনের কাছে নিজেদের দাবি জানিয়ে আসছেন। স্থানীয় প্রশাসন আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে বলে তাঁদের অভিযোগ। বর্তমানে তাঁদের দাবি পাঁচ দফা। এসব দাবি পূরণে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেলে কর্মসূচি প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

সাজেকবাসীর পাঁচ দফা দাবিতে পাঁচ সংগঠনের সমর্থন

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে চলমান সড়ক অবরোধে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পর্যটন, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ স্থানীয় বিভিন্ন খাত অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে সাজেক থেকে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সন্তু লারমা-সমর্থিত দলের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারসহ পাঁচ দফা দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাঁচটি সংগঠন।

রোববার (২৫ অক্টোবর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে এ সমর্থনের কথা জানান গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের সভাপতি জিকো ত্রিপুরা, পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের সভাপতি কনিকা দেওয়ান, ইউনাইটেড ওয়ার্কার্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের সহসাধারণ সম্পাদক প্রমোদ জ্যোতি চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নীতি চাকমা এবং বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সভাপতি সমর চাকমা। একই সঙ্গে তাঁরা অবিলম্বে দাবিগুলো মেনে নিতে সরকার ও প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।

বিবৃতিতে সংগঠনগুলোর নেতারা অভিযোগ করেন, গত ২২ অক্টোবর সাজেকের উজোবাজারে শান্তিপূর্ণ অবরোধ চলাকালে সেনাবাহিনী ও পুলিশ হামলা চালায়। এতে ৭০ জনের বেশি নারী-পুরুষ ও বয়স্ক ব্যক্তি আহত হন। এ সময় ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও সাজেক কলেজে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও করেন তাঁরা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি।

পর্যটকদের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনা নিয়ে আইএসপিআর ও রাঙামাটি জেলা পুলিশের বক্তব্যকে মিথ্যা দাবি করে এর প্রতিবাদ জানান পাঁচ সংগঠনের নেতারা। এ ছাড়া আন্দোলনের সমর্থনে বক্তব্য দেওয়ায় এসএসসি পরীক্ষার্থী ঝরণা চাকমাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টার অভিযোগেও নিন্দা জানান তাঁরা।

বিবৃতিতে বলা হয়, শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ, অবরোধ ও মতপ্রকাশ নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার। আলোচনার মাধ্যমে দাবি পূরণ না করে বলপ্রয়োগ করা হলে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। এতে পর্যটনসহ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সাজেকবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারসহ পাঁচ দফা দাবি মেনে নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সংগঠনগুলোর নেতারা।

ইমামুল

ট্যাগ: রাঙামাটি সাজেক পার্বত্য চট্টগ্রাম পর্যটন ব্যবসা রাঙামাটি জেলা প্রশাসন বাংলাদেশের পর্যটন সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাজেক অবরোধ সাজেকে গোলাগুলি ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ বাঘাইছড়ি সাজেক সংঘর্ষ সাজেকের অস্থিরতা নাজমা আশরাফী আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া দীপেন দেওয়ান ভবতোষ দেওয়ান নতুন জয় চাকমা সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি জনসংহতি সমিতি সন্তু লারমা পাহাড়ি রাজনীতি সংলাপ কমিটি সাজেকের পাঁচ দফা দাবি পর্যটন সংকট পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘ গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ইউনাইটেড ওয়ার্কার্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট হিল উইমেন্স ফেডারেশন রাঙামাটির সংবাদ

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত