ঢাকা, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩
পে-স্কেলের গেজেট নিয়ে যা বলছেন কর্মকর্তারা
নিজস্ব প্রতিবেদক: এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারির কথা থাকলেও মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের প্রায় দুই সপ্তাহ পরও তা প্রকাশ হয়নি। সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেলের গেজেট এখনো জারি না হওয়ায় তাঁদের অনেকের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি একজন কর্মকর্তা বলেন, “এক সপ্তাহের জায়গায় দুই সপ্তাহ পার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু গেজেটের কোনো খবর নাই। সেজন্যই সবার মধ্যে একটা উদ্বেগ কাজ করছে যে, আবার কোথায় আটকালো!।”
নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন প্রকাশে বিলম্বের কারণেই সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে এই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতি পাঁচ বছর পরপর নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার কথা থাকলেও গত দশ বছরে তা হয়নি।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর গত ৩১ আগস্ট বাংলাদেশের সরকার নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানানো হয়। তখন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, সপ্তাহখানেকের মধ্যেই এটি প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা হতে পারে। কিন্তু প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও গেজেট জারি হয়নি। এ কারণে সরকারি চাকরিজীবীদের অনেকের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।
তবে সাবেক আমলাদের কেউ কেউ বলছেন, প্রজ্ঞাপন জারি হতে সময় লাগায় হতাশ হওয়ার কারণ নেই।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর গেজেট প্রকাশের আগে যে প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করতে হয়, তাতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কখনো কখনো মাসও লেগে যেতে পারে। তাঁর মতে, এবার দীর্ঘদিন পর পে-স্কেলের ঘোষণা আসায় বিষয়টি নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছে।
মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর নতুন বেতন কাঠামোর খসড়া যাচাই-বাছাইয়ের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এমন খবর স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবে দুই মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খসড়াটি এখনো আইন মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায়নি; বরং সেটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছেই রয়েছে। ফলে গত দুই সপ্তাহ ধরে খসড়াটি কেন সেখানে রয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে গেজেট প্রকাশে আরও কত সময় লাগতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চলতি বছরের আগে সর্বশেষ জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণা হয়েছিল ২০১৫ সালে। ওই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। এরপর ১৫ ডিসেম্বর, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে তিন মাস পর অর্থ মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে।
কর্মকর্তারা বলছেন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আগে প্রশাসনিক ও আইনগত নানা প্রস্তুতি নিতে হয়। এর প্রথম ধাপ হলো প্রজ্ঞাপনের বিস্তারিত খসড়া তৈরি করা, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।
সাবেক সচিব ড. মো. আনোয়ার উল্ল্যাহ বলেন, “নতুন পে-স্কেলের অনুমোদন চেয়ে যে খসড়াটা মন্ত্রিসভায় পাঠানো হয়, সেখানে মূলত মোটাদাগে কোন গ্রেডে কত টাকা বেতন-ভাতা বাড়ানো হবে, সেটার একটা প্রস্তাবনা থাকে। কিন্তু অনুমোদন পাওয়ার পর প্রজ্ঞাপনের খসড়া তৈরি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাদের ক্ষেত্রে কীভাবে সেটি বাস্তবায়িত হবে, সেটার হিসাবটা কী হবে- এসব বিষয়গুলোর বিস্তারিত বর্ণনা ও নির্দেশনা দিয়ে প্রজ্ঞাপনের খসড়া প্রস্তুত করা হয়,”
এই খসড়ায় জনপ্রশাসনের পাশাপাশি সেনা-নৌ ও বিমান বাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ, সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা কোন প্রক্রিয়ায় এবং কীভাবে কার্যকর হবে, তারও বিস্তারিত উল্লেখ থাকে। মি. উল্ল্যাহ বলেন, “আগে থেকে প্রস্তুতি না থাকলে অনেক সময় এসব কাজ করতেই বেশ খানিকটা সময় লেগে যায়,”
খসড়া প্রস্তুত হওয়ার পর সেটি আইন মন্ত্রণালয়ে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পাঠানো হয়। প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো সংবিধান বা চাকরি-সংক্রান্ত বিভিন্ন আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, সেখানে তা পরীক্ষা করা হয়।
এ ছাড়া খসড়ায় ব্যবহৃত শব্দ, বাক্য ও আইনি পরিভাষায় কোনো অস্পষ্টতা বা দ্ব্যর্থবোধকতা রয়েছে কি না, সেটিও দেখা হয়। ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা বা ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ যাতে না থাকে, সে জন্য এ যাচাই করা হয়। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় বিধিমালা বা সংবিধিবদ্ধ আদেশের খসড়াও এ পর্যায়ে চূড়ান্ত করা হয়।
সাবেক সচিব মি. উল্ল্যাহ জানান, “এসব প্রক্রিয়া শেষ করে প্রজ্ঞাপনের চূড়ান্ত খসড়া আইন মন্ত্রণালয় থেকে পুনরায় অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো,”
এরপর অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা প্রজ্ঞাপনের চূড়ান্ত খসড়া মুদ্রণের জন্য সরকারি মুদ্রণালয়, তথা বিজি প্রেসে পাঠান। মুদ্রণ শেষ হলে সেটি সংগ্রহ করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়।
খসড়া পায়নি আইন মন্ত্রণালয়
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপনের খসড়া এখনো আইন মন্ত্রণালয়ে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পাঠানো হয়নি।
আইন মন্ত্রণালয়ের নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রবিবার বিকেলে বলেন, “গত সপ্তাহ আমরা শুনেছিলাম যে, দুই-এক দিনের মধ্যেই অনুমোদিত পে-স্কেলের ড্রাফটটা ভেটিংয়ের জন্য আমাদের কাছে পাঠানো হবে, কিন্তু এখন পর্যন্ত সেটা আমাদের হাতে আসেনি,”
ওই কর্মকর্তা জানান, খসড়াটি এখনো অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছেই রয়েছে। মন্ত্রিসভা অনুমোদন দেওয়ার দুই সপ্তাহ পরও সেটি আইন মন্ত্রণালয়ে না আসার কারণ জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, এটি আটকে রাখার বিষয় নয়। গেজেট প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে কিছুটা সময় লাগছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা জানান, সামরিক-বেসামরিক বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ প্রজ্ঞাপনের খসড়া তৈরির কাজ চলছে। তিনি বলেন, “দ্রুতই ভেটিংয়ের জন্য এটা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে, তারপর প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
কার কত বেতন বাড়ছে?
এক দশকেরও বেশি সময় পর ঘোষিত নতুন বেতন কাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীদের অনেকের বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রথম থেকে ১১তম গ্রেডের কর্মকর্তাদের বেতন সর্বোচ্চ একশো শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ এসব গ্রেডে বেতন আগের তুলনায় দ্বিগুণ হচ্ছে।
সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। নতুন পে-স্কেলে তাঁদের মূল বেতন সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা নির্ধারিত হয়েছে। আর প্রথম গ্রেডের কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন পে-স্কেল মোট তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। এটি চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। অর্থাৎ জুলাই মাস হিসাব করেই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন পে-স্কেলের সুবিধা পাবেন। প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এই বেতন-ভাতা দিতে সরকারের বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা।
যেভাবে এলো নতুন পে-স্কেল
এর আগে ২০২৫ সালে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫’ গঠন করে। ওই কমিশন গত ২২ জানুয়ারি সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছিল।
কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যমান সর্বনিম্ন বেতন স্কেল আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপ ৭৮ হাজার টাকা থেকে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়।
এ ছাড়া বৈশাখী ভাতার হার ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা এবং যাতায়াত ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত ব্যাপক সংস্কারের প্রস্তাব ছিল।
বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর চলতি বছরের ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির সুপারিশ বিবেচনায় নিয়েই তারেক রহমানের সরকার নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন দেয়।
ইএইচপি
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- ঢাবি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের ১১তম মাসিক সভা অনুষ্ঠিত
- ঢাবির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সিরাজুল হক আর নেই
- নব্বইয়ের দশকের রেট্রো ছবি বানাবেন যেভাবে, জেনে নিন ১০ AI প্রম্পট
- পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ নিয়ে সুখবর দিল মন্ত্রণালয়
- ব্যালন ডি’অর ২০২৬-এর ৩০ ফুটবলারের তালিকা প্রকাশ
- ১১-২০ গ্রেডের চাকরিতে ভাইভার নম্বর বাড়ছে
- বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানের ভাইভার তারিখ প্রকাশ
- নতুন পে-স্কেলে মোবাইল ভাতা পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা, কোন গ্রেডে কত?
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (৭ সেপ্টেম্বর)
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (১১ সেপ্টেম্বর)
- বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ৬১৮ প্রভাষকের চাকরি স্থায়ীকরণ
- নারী এশিয়া কাপ সেমিফাইনাল: কবে, কখন কোন দলের ম্যাচ
- আজকের নামাজের সময়সূচি (৮ সেপ্টেম্বর)
- বুটেক্সে ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা
- স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে মাহমুদা মিতু