ঢাকা, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বিনিয়োগকারীদের অর্থ নিয়ে রহস্য, লুব-রেফকে ঘিরে নতুন বিতর্ক

২০২৬ জুন ০৬ ২৩:২৯:০৬

বিনিয়োগকারীদের অর্থ নিয়ে রহস্য, লুব-রেফকে ঘিরে নতুন বিতর্ক

অর্থনীতি ডেস্ক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত লুব-রেফ (বাংলাদেশ) লিমিটেডকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদন। কোম্পানিটির আর্থিক হিসাবে শত শত কোটি টাকার সম্পদ ও চলমান প্রকল্প দেখানো হলেও সরেজমিন যাচাইয়ে এর বড় অংশের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ইসলাম জাহিদ অ্যান্ড কোংয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রিমিয়ামে শেয়ার বিক্রি করে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল লুব-রেফ। সেই অর্থ নতুন প্রকল্প, যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে সেই ব্যয়ের যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে দাবি নিরীক্ষকদের।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কোম্পানিটি ৫৮৪ কোটি ৪০ লাখ টাকার স্থায়ী সম্পদ দেখিয়েছে। তবে সরেজমিনে যাচাইয়ের সময় অন্তত ১১৪ কোটি ৯২ লাখ টাকার সম্পদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

একইভাবে কোম্পানির আর্থিক হিসাবে ২১২ কোটি ২৬ লাখ টাকার ক্যাপিটাল ওয়ার্ক-ইন-প্রগ্রেস (সিডব্লিউআইপি) বা নির্মাণাধীন প্রকল্প দেখানো হলেও নিরীক্ষকরা কোনো দৃশ্যমান প্রকল্প বা নির্মাণকাজের প্রমাণ পাননি। ফলে আইপিও থেকে সংগৃহীত অর্থের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানটির অংশীদার এসএম আব্দুল হামিদ বলেন, কোম্পানির শিফট ইঞ্জিনিয়ারের উপস্থিতিতে সম্পদ যাচাই করা হলেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। তার অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সম্পদ সৃষ্টির নামে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ব্যবহারে গুরুতর অসঙ্গতি থাকতে পারে।

এদিকে কাঁচামাল ও প্যাকেজিং পণ্য ক্রয়ের হিসাবেও গরমিলের অভিযোগ তুলেছে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। কোম্পানি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকার কাঁচামাল কেনার তথ্য দিলেও মূসক নথিতে ওই অঙ্ক ৩১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বলে উল্লেখ রয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হিসাববিদ মনোয়ার হোসেন। তার মতে, কাগজে শত শত কোটি টাকার নির্মাণাধীন প্রকল্প দেখানো হলেও বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব না থাকলে তা শুধু হিসাবগত ভুল নয়, বরং অর্থ আত্মসাৎ বা ভুয়া সম্পদ প্রদর্শনের আশঙ্কাও তৈরি করে। এতে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

২০২১ সালে শেয়ারবাজারে আসা লুব-রেফ সে সময় ২০১৯-২০ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ২ দশমিক ৫৬ টাকা মুনাফা দেখিয়েছিল। বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কোম্পানিটির কাট-অফ মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩০ টাকা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ২৭ টাকা দরে শেয়ার ইস্যু করা হয়। তবে গত ৪ জুন পর্যন্ত শেয়ারটির বাজারদর নেমে এসেছে ১১ দশমিক ২০ টাকায়।

অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে লুব-রেফ কর্তৃপক্ষ। কোম্পানির সচিব কবির হোসাইন বলেন, সিডব্লিউআইপির ২১২ কোটি ২৬ লাখ টাকা কোনো এক বছরের ব্যয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপের ব্যয়ের সমষ্টি। পরিকল্পনা, ডিজাইন, ইঞ্জিনিয়ারিং ও যন্ত্রপাতি নির্বাচনসহ অনেক ব্যয় প্রাথমিক পর্যায়ে দৃশ্যমান অবকাঠামো হিসেবে প্রতিফলিত হয় না।

তিনি আরও দাবি করেন, স্থায়ী সম্পদের বিষয়ে নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণ তথ্যভিত্তিক নয়। প্রকল্প সাইটে গাইড হিসেবে উপস্থিত থাকা শিফট ইঞ্জিনিয়ারের কোম্পানির সব সম্পদ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা ছিল না। এছাড়া কাঁচামাল ক্রয়ের হিসাব ও মূসক নথির পার্থক্য সময়ভিত্তিক সমন্বয়ের কারণে হয়েছে।

তবে এসব ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন হিসাববিদ মনোয়ার হোসেন। তার মতে, পরিকল্পনা পর্যায়ের কিছু ব্যয় দৃশ্যমান না হলেও শত শত কোটি টাকার নির্মাণাধীন প্রকল্পের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব না থাকা স্বাভাবিক নয়। হিসাবের খাতায় সম্পদ থাকলেও বাস্তবে তা পাওয়া না গেলে আর্থিক প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

এমজে/

শেয়ারবাজারের বিশ্লেষণ ও ইনসাইড স্টোরি পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

ফের কমেছেসোনার দাম

ফের কমেছেসোনার দাম

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের স্বর্ণপ্রেমীদের জন্য স্বস্তির খবর এসেছে। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজার পরিস্থিতির প্রভাবে আবারও সোনার দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে... বিস্তারিত