ঢাকা, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩
ফ্যাসিবাদ রাজনৈতিক দলের নাম নয়, ভাইরাস: জামায়াত আমির
নিজস্ব প্রতিবেদক: ফ্যাসিবাদ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নাম নয়, বরং এটি একটি ভাইরাস এমন মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তাঁর মতে, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে ফ্যাসিবাদের লক্ষণ দেখা দিলে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ বাধাগ্রস্ত হয়। মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা না হলে দেশে বারবার বিপ্লব ফিরে আসবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আজ শুক্রবার জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, যারা জনগণের মনের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হবেন এবং মানুষের অধিকার উপেক্ষা করবেন, তাঁদের পরিণতিও ৭ নভেম্বরের মতো হতে পারে।
জামায়াত আমির মনে করেন, ৭ নভেম্বরের মূল শিক্ষা রাজনীতিবিদেরা গ্রহণ করতে পারেননি। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে দিবসটির তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা হলেও রাজনীতিবিদেরা এর মূল শিক্ষা উপলব্ধি করতে পারেননি। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের পেছনে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের প্রতি অবজ্ঞা, অপমান ও উপেক্ষাসহ নানা কারণ কাজ করেছিল। সেদিনের অভ্যুত্থানের শুরুতে জনগণের সরাসরি সম্পৃক্ততা না থাকলেও পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের ব্যাপক সমর্থন তৈরি হয়।
১৯৭২ সালে ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ওই সময় ইসলামী সংগঠনগুলো নিষিদ্ধ করা হয়। অথচ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এসব সংগঠন সক্রিয় ছিল।
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো কাজ করবে না বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই অবস্থান থেকে সরে আসা হয়।’
শফিকুর রহমানের ভাষ্য, বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসার পরও অল্প সময়ের মধ্যে তৎকালীন সরকার জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার ও গণমাধ্যম থাকার পরও নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয়।
তিনি দাবি করেন, ‘বাহিনীটিকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন, বিনা বিচারে হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে।’
রক্ষীবাহিনীর কার্যক্রমের বর্ণনা দিতে গিয়ে জামায়াত আমির বলেন, এ বাহিনীর হাতে ৩৪ হাজার মানুষ বিনা বিচারে নিহত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ১০ হাজার ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা।
মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ শিকদার হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তাঁকে হত্যার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে ‘কোথায় সে?’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। এ ধরনের বক্তব্য বিচারব্যবস্থার প্রতি অবজ্ঞা এবং বিচারহীনতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার শামিল।
তৎকালীন শাসনব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করা হয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় এক ব্যক্তির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। বাকশালের সাংবিধানিক ব্যবস্থায় বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকা পর্যন্ত রাষ্ট্রপ্রধান থাকার বিধান রাখা হয়েছিল।’
সেই সময়ের অর্থনৈতিক দুরবস্থা, দুর্নীতি ও লুটপাটের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের সম্পদ পাচার এবং ত্রাণসামগ্রী বিতরণে অনিয়মের কারণে সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছিল। সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য আট কোটি কম্বল আসার কথা থাকলেও মানুষ কম্বল পায়নি। এ পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু নিজেও একবার বলেছিলেন, অন্য দেশের নেতারা স্বাধীনতার পর সোনার খনি পেয়েছেন, আর তিনি পেয়েছেন চোরের খনি।
৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনা করে জামায়াত আমির বলেন, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা অভ্যুত্থান হয়। ৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত জিয়াউর রহমান বন্দি ছিলেন। পরে সিপাহিরা সংগঠিত হয়ে তাঁকে মুক্ত করেন। ভোররাতে ট্যাংক ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে সিপাহিরা রাস্তায় নামলে সাধারণ মানুষ তাঁদের স্বাগত জানান। মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে বের হওয়া মানুষ তাকবির দেন এবং ফুল ছিটিয়ে অভ্যুত্থানকারীদের প্রতি সমর্থন জানান।
নিজের স্মৃতিচারণা করে শফিকুর রহমান বলেন, ওই সময় তিনি সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্র ছিলেন। ৭ নভেম্বরের পরদিন শুক্রবার কারফিউ জারি থাকলেও জুমার নামাজের জন্য তিন ঘণ্টা তা শিথিল করা হয়েছিল। নামাজে যাওয়ার পথে মসজিদ, বাড়ির ছাদ ও রাস্তায় শিশু থেকে বৃদ্ধ বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতি দেখেছিলেন তিনি। মানুষের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস ছিল।
তাঁর মতে, কারফিউর কারণে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া পুরোপুরি প্রকাশের সুযোগ না হলেও সেদিনের উপস্থিতি জনসমর্থনের একটি চিত্র তুলে ধরেছিল। সিপাহিরা বিপ্লবের সূচনা করলেও জনগণের সমর্থনই ঘটনাটিকে ব্যাপক তাৎপর্য দিয়েছিল। এ কারণেই দিনটি বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকা প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ৭ নভেম্বরের পর তিনি পর্যায়ক্রমে প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে বিএনপি গঠন করেন। তবে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা এবং ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
স্বাধীনতার ইতিহাসে সব অবদানকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ইতিহাসে কাউকে ছোট করার প্রয়োজন নেই। স্বাধীনতার ঘোষণা যিনি দিয়েছেন, তাঁর অবদান যেমন স্বীকার করতে হবে, তেমনি স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী তরুণ নেতার ভূমিকাও আলোচনায় রাখতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সফল নেতৃত্ব দেওয়া জেনারেল এম এ জি ওসমানীর অবদানও যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। নিজের বা নিজ দলের নেতৃত্বের বাইরে অন্যদের অবদান স্বীকার না করার মানসিকতা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে বেরিয়ে আসতে হবে।
১৫ আগস্ট ও ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে তৎকালীন দুঃশাসন, একদলীয় শাসন এবং কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষের আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, মানুষ স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল। তাদের প্রত্যাশা ছিল কথা বলার স্বাধীনতা, জীবনের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার এবং নারী-পুরুষের সমান নাগরিক অধিকার।
তৎকালীন সংবাদমাধ্যমের পরিস্থিতি তুলে ধরে শফিকুর রহমান বলেন, চারটি সংবাদমাধ্যম ছাড়া অন্য সব সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ওই চারটি সংবাদমাধ্যমও সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, ১৯৯০ সালেও দেশে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল। জনগণের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর বিচারপতি সাত্তার গণতন্ত্রের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। একপর্যায়ে তিনি সেনাপ্রধানের হাতে ক্ষমতা তুলে দেন। জনগণের কাছ থেকে পাওয়া ম্যান্ডেট রক্ষা করা তাঁর দায়িত্ব ছিল বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ক্ষমতা গ্রহণের পর নয় বছর দেশ শাসন করেন এরশাদ। তাঁর শাসনামলেও মানুষের বাক্স্বাধীনতা ও বেঁচে থাকার অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত জনগণের আন্দোলনের মুখে তাঁকেও ক্ষমতা ছাড়তে হয়।
জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা গুলিতে নিহত হলেও আশপাশের অন্যদের শরীরে গুলির আঘাত পাওয়া যায়নি। এ ঘটনা নিয়ে সে সময় নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের অতীত রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের সময় পর্যাপ্ত আসন না থাকায় জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসন নিয়ে সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল। তবে তারা সরকারে যোগ দেয়নি কিংবা কোনো রাজনৈতিক জোটেও যায়নি। বিরোধী দলেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল দলটি।
তিনি বলেন, সে সময় জামায়াতের পক্ষ থেকে নির্বাচনে জনগণের ভোটের প্রতিফলন নিশ্চিত করার জন্য যে পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়। কিন্তু বিএনপি সরকার সেই দাবি বাস্তবায়ন করেনি। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৪ সাল থেকে এ দাবিতে আন্দোলন শুরু করে জামায়াত।
রাজনীতিতে সমঝোতা ও নমনীয়তার গুরুত্ব তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে পারস্পরিক সমঝোতা। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ দুটি বিষয় না থাকলে রাজনীতি জনগণের কল্যাণের পরিবর্তে সংঘাতের দিকে চলে যায়। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে তৎকালীন সরকারকে শেষ পর্যন্ত সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
বক্তব্যের শেষাংশে শফিকুর রহমান বলেন, ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার চেষ্টা, জনগণের অধিকার হরণ কিংবা ভিন্নমত দমনের পরিণতি কখনোই ভালো হয় না। জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও অধিকারকে সম্মান করতে না পারলে রাজনৈতিক পরিবর্তন আবারও অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
ইএইচপি
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার তারিখ জেনে নিন
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (৩১ অক্টোবর)
- এইচএসসি পুনর্নিরীক্ষণের ফল কবে, জানাল বোর্ড
- মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেবে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (০৩ নভেম্বর)
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (০১ নভেম্বর)
- এইচএসসিতে সর্বোচ্চ জিপিএ-৫ ঢাকা বোর্ডে, সর্বনিম্ন বরিশালে
- বিশ্ববিদ্যালয়-মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা কি পেছাচ্ছে?
- এইচএসসিতে পাস করা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাবেন: শিক্ষামন্ত্রী
- যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণীর সঙ্গে যৌন বিকৃতির অভিযোগে সাবেক শিবির নেতা গ্রেপ্তার
- এইচএসসির ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করবেন যেভাবে, জানুন বিস্তারিত
- এইচএসসিতে পাস করতে পারেননি প্রায় অর্ধেক পরীক্ষার্থী
- পুলিশের ৭৮ পরিদর্শক পদোন্নতি পেয়ে হলেন এএসপি
- সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার্থীদের ঢাবির ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিয়ে যা জানা গেল
- জাতীয় সংসদে ইউএনডিপির ইয়ং ফেলোশিপ, আবেদন করতে পারবেন যারা