ঢাকা, সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩

এনবিআরের ২৪ কর্মকর্তার শাস্তি মওকুফের প্রক্রিয়া শুরু

২০২৬ আগস্ট ৩১ ০৮:৫২:৫০

এনবিআরের ২৪ কর্মকর্তার শাস্তি মওকুফের প্রক্রিয়া শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিভাজনের প্রতিবাদে আন্দোলনের কারণে সাময়িক বরখাস্ত ও পরে লঘুদণ্ড পাওয়া ২৪ কর্মকর্তার শাস্তি মওকুফের প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। এরই মধ্যে আয়কর ক্যাডারের ১৪ জন এবং কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট ক্যাডারের ১০ কর্মকর্তা শাস্তি মওকুফ চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেছেন। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রক্রিয়া শেষ হলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হয়ে তা রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে।

এনবিআরের পক্ষ থেকেও এসব কর্মকর্তার শাস্তি মওকুফের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এ ঘটনার কারণে কর্মকর্তাদের মধ্যে যে অস্বস্তি ও মনোবলহীনতা তৈরি হয়েছে, শাস্তি মওকুফ হলে তা কাটিয়ে রাজস্ব আহরণে গতি ফিরবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমাদের যে দণ্ড দেওয়া হয়েছে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেছি। এখানে মাফ পাওয়ার কোনো বিষয় নেই। তিনি চাইলে দণ্ড আরও বাড়াতে পারেন, অথবা আমাদের আবেদন গ্রহণ করতে পারেন।’

২০২৫ সালের মে মাসে এনবিআরকে ভেঙে রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুটি পৃথক বিভাগ করার অধ্যাদেশ জারির পর এর বিরোধিতা করে আন্দোলনে নামেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

কর্মকর্তাদের অভিযোগ ছিল, এনবিআরকে বিভক্ত করা হলে তাদের পদ, দায়িত্ব, ক্যারিয়ার কাঠামো ও সাংগঠনিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ অবস্থায় অধ্যাদেশ বাতিল ও সংশোধনের দাবিতে ‘এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ’ আন্দোলনে নামে।

পর্যায়ক্রমে আন্দোলন কঠোর রূপ নেয় এবং এনবিআরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে থাকে। একপর্যায়ে দেশের বিভিন্ন কাস্টম হাউজ ও স্থলবন্দরের কার্যক্রমেও অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। আমদানি-রপ্তানি পণ্য খালাস বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যস্থতায় আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়।

আন্দোলন প্রত্যাহারের সময় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। একই অবস্থানে ছিলেন তৎকালীন এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান। পাশাপাশি অধ্যাদেশ সংশোধনের বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটিও গঠন করা হয়।

পরে আন্দোলনে সরাসরি সম্পৃক্ত ৩৯ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয় অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি)। এর মধ্যে এনবিআরের তিন সদস্য ও একজন কমিশনারকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।

অন্য কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত করার পর তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলে। পরবর্তী সময়ে লঘুদণ্ড হিসেবে কয়েকজনের বেতন গ্রেড দুই থেকে সর্বোচ্চ তিন ধাপ পর্যন্ত অবনমন করা হয়। এতে কর্মকর্তারা আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি পদোন্নতিতেও বাধার মুখে পড়েন।

এরপর থেকেই এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ ও মনোবলহীনতা তৈরি হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। এর প্রভাব রাজস্ব আহরণেও পড়েছে বলে মনে করছেন তারা। গত অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে।

সম্প্রতি এনবিআরের রাজস্ব সম্মেলনে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনা হয়। সেখানে কর্মকর্তারা আন্দোলনের ঘটনায় দেওয়া শাস্তি মওকুফের আবেদন জানান। এ সময় শাস্তি মওকুফের বিষয়ে ইতিবাচক আশ্বাস পাওয়া যায়।

এর ধারাবাহিকতায় গত সপ্তাহে আয়কর ক্যাডারের ১৪ জন এবং কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট ক্যাডারের ১০ কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতির কাছে শাস্তি মওকুফের আবেদন করেছেন।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এটিকে কেন্দ্র করে এনবিআরের কর্মকর্তাদের নৈতিকতায় বড় ধরনের চিড় ধরেছিল। ফলে রাজস্ব আদায়েও গতি হারাতে থাকে। সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, আমি মনে করি তা কর্মকর্তাদের মোটিভেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

তার মতে, বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে রাজস্ব কর্মকর্তাদের মনোবল ও কর্মচাঞ্চল্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শাস্তি মওকুফ হলে কর্মকর্তাদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা যাবে। তবে একই সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কিংবা আন্দোলনের ক্ষেত্রে সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘনের মতো পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে হবে।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত