ঢাকা, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩

গরমে পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে কেন?

২০২৬ জুলাই ১৫ ১৬:১১:৫৫

গরমে পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে কেন?

ডুয়া ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দাবদাহ বা হিটওয়েভ দীর্ঘস্থায়ী ও আরও তীব্র হয়ে উঠছে। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, তীব্র গরমের এই প্রভাব নারী ও পুরুষের ওপর সমানভাবে পড়ে না। জৈবিক, হরমোনজনিত এবং সামাজিক বিভিন্ন কারণে প্রচণ্ড গরমে পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত তাপমাত্রার সংস্পর্শে থাকলে নারীদের শরীরে মারাত্মক চাপ তৈরি হতে পারে। এর ফলে মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, উদ্বেগ, হাত-পা ফুলে যাওয়া, অনিদ্রা, মনোযোগের ঘাটতি এবং হিটস্ট্রোকের মতো গুরুতর তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের নারী স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. নিঘাত আরিফ তীব্র দাবদাহকে হৃদযন্ত্র ও রক্তনালী ব্যবস্থার (কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেম) জন্য একটি ‘স্ট্রেস টেস্ট’ বা কঠিন পরীক্ষা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, চরম গরমে শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে হৃদযন্ত্রকে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়।

নারীরা কেন গরমে বেশি আক্রান্ত হন

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের শরীর থেকে সাধারণত কম ঘাম নির্গত হয় এবং তুলনামূলক বেশি তাপমাত্রায় পৌঁছানোর পর ঘাম শুরু হয়। ফলে শরীরের স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হওয়ার প্রক্রিয়া কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়।

এ ছাড়া নারীদের শরীরে সাধারণত চর্বির (বডি ফ্যাট) পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ গড় তাপমাত্রাও সামান্য বেশি। অতিরিক্ত চর্বি শরীরের তাপ ধরে রাখার ক্ষেত্রে ইনসুলেশনের মতো কাজ করে।

হরমোনের ওঠানামাও শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে। ঋতুস্রাব (পিরিয়ড), গর্ভাবস্থা, স্তন্যদান এবং মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন হরমোনের পরিবর্তন শরীরকে ঠান্ডা রাখার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে।

চিকিৎসকদের মতে, ঋতুচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে তীব্র গরমে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। পিরিয়ডের আগে প্রজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা বাড়ায় শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। আবার পিরিয়ড চলাকালে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় শরীর তাপ নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় পড়ে।

পাশাপাশি পিরিয়ডের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে শরীরে আয়রনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এর ফলে গরমের দিনে অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, ঘুমের ব্যাঘাত এবং মনোযোগের ক্ষমতা কমে যেতে পারে।

গর্ভাবস্থা ও মেনোপজে বাড়ে ঝুঁকি

পেরিমেনোপজ বা মেনোপজের মধ্য দিয়ে যাওয়া নারীদের ক্ষেত্রে দাবদাহের সময় ‘হট ফ্ল্যাশ’ (হঠাৎ শরীর ও বুক গরম হয়ে ওঠা) এবং রাতে অতিরিক্ত ঘামের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, গর্ভাবস্থায় হিটস্ট্রোক বা তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকিও অনেক বেড়ে যায়।

খ্যাতনামা চিকিৎসা সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, গর্ভাবস্থায় নারীর শরীরের মেটাবলিজম, রক্তের পরিমাণ এবং তরলের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এতে হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। অতিরিক্ত গরমে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে গর্ভবতী মা ও শিশু উভয়ের ক্ষেত্রেই জটিলতা তৈরি হতে পারে।

সামাজিক ও জীবনযাত্রার প্রভাব

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথ-এর ড. কেট পেনহাউ গোমেস জানান, নারীরা সাধারণত পরিবার ও সংসারের সেবামূলক কাজে বেশি যুক্ত থাকেন। ফলে দাবদাহের সময় নিজেদের স্বাস্থ্যের প্রতি প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেওয়া অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া পুরুষদের তুলনায় নারীদের গড় আয়ু বেশি হওয়ায় বয়স্ক নারীদের একটি অংশ তীব্র গরমে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। বার্ধক্য, ডিমেনশিয়া বা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ ব্যবহারের কারণে তৃষ্ণার অনুভূতি কমে যেতে পারে, যা দ্রুত পানিশূন্যতার কারণ হতে পারে।

তাপজনিত অসুস্থতার সতর্ক সংকেত

অতিরিক্ত গরমে শরীর কাহিল হয়ে পড়লে (হিট এক্সহস্টিং) যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে—

মাথা ঘোরা বা হালকা লাগা

তীব্র শারীরিক দুর্বলতা

বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া

পেশিতে টান লাগা (মাসল ক্র্যাম্প)

ত্বক ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে হয়ে যাওয়া

অজ্ঞান হয়ে যাওয়া

হিটস্ট্রোক একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি। এর লক্ষণগুলো হলো-

শরীরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ওপরে উঠে যাওয়া

শরীর অত্যন্ত গরম ও শুষ্ক হয়ে যাওয়া (কোনো ঘাম না হওয়া)

মানসিক বিভ্রান্তি বা অসংলগ্ন আচরণ

জ্ঞান হারানো বা খিঁচুনি হওয়া

সুরক্ষায় চিকিৎসকদের পরামর্শ

তীব্র গরমে নারীদের সুস্থ থাকতে চিকিৎসকেরা কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে-

১. সারাদিনে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি ও তরল খাবার গ্রহণ করা।

২. দুপুরের তীব্র রোদে ঘরের বাইরে কাজ করা থেকে বিরত থাকা।

৩. ব্যায়াম বা হাঁটার মতো শারীরিক কাজ ভোরে অথবা সূর্যাস্তের পর করা।

৪. হালকা রঙের ঢিলেঢালা পোশাক পরা এবং বাইরে বের হলে সানস্ক্রিন ব্যবহার করা।

৫. পিরিয়ড, গর্ভাবস্থা বা মেনোপজের সময় শরীরে তরলের ভারসাম্য বজায় রাখতে বাড়তি যত্ন নেওয়া।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তীব্র দাবদাহ মোকাবিলায় কর্মক্ষেত্র ও সরকারি নীতিমালায় নারীদের বিশেষ স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা মানে পুরো পরিবার ও সমাজের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখা।

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

বিশ্ববাজারে কমেছে স্বর্ণের দাম

বিশ্ববাজারে কমেছে স্বর্ণের দাম

নিজস্ব প্রতিবেদক: আন্তর্জাতিক বাজারে টানা ঊর্ধ্বগতির পর বুধবার স্বর্ণের দাম কমেছে। তেলের দাম বাড়তে থাকায় মূল্যস্ফীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার... বিস্তারিত