ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩

দারিদ্র্য পেরিয়ে বিশ্বসেরা হওয়ার গল্প ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের

২০২৬ জুন ২৫ ১৫:৪১:৩২

দারিদ্র্য পেরিয়ে বিশ্বসেরা হওয়ার গল্প ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের

নিজস্ব প্রতিবেদক: আজ তিনি বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর উইঙ্গার। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য আতঙ্কের নাম। কিন্তু যে ছেলেটিকে এখন কোটি মানুষ চেনে, তার যাত্রা শুরু হয়েছিল ব্রাজিলের এক সাধারণ পরিবার থেকে, যেখানে স্বপ্ন ছিল বড়, কিন্তু সামর্থ্য ছিল সীমিত।

ছোট্ট কোর্টে জন্ম নেওয়া স্বপ্ন

২০০০ সালের ১২ জুলাই ব্রাজিলের সাও গনসালো শহরে জন্ম ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল অদম্য টান। তবে তার প্রথম পরিচয় ছিল ফুটসালের সঙ্গে। ছোট কোর্টে দ্রুতগতির খেলা, ক্ষণিকের সিদ্ধান্ত আর নিখুঁত বল নিয়ন্ত্রণ-এসবই ধীরে ধীরে গড়ে তোলে তার ফুটবল ব্যক্তিত্ব।

পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা স্বচ্ছল ছিল না। অনুশীলনে যাওয়া, খেলাধুলার সরঞ্জাম কেনা কিংবা যাতায়াতের খরচ—সবকিছুই হিসাব কষে করতে হতো। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা কখনো তার স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াননি। বরং নিজেদের প্রয়োজন কমিয়ে ছেলের স্বপ্ন পূরণের পথ তৈরি করে দিয়েছেন।

ফ্লামেঙ্গোতে শুরু, সেখান থেকেই উড়াল

ভিনিসিয়ুসের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে যখন তিনি তার প্রিয় ক্লাব ক্লুবে দে রেগাতাস দো ফ্লামেঙ্গোর একাডেমিতে সুযোগ পান। ফুটসাল থেকে বড় মাঠের ফুটবলে মানিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। তবু তার গতি, ড্রিবলিং আর আক্রমণাত্মক খেলার ধরন খুব দ্রুতই সবার নজর কাড়ে।

অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বয়সভিত্তিক দলগুলো পেরিয়ে মূল দলে জায়গা করে নেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে ফ্লামেঙ্গোর সিনিয়র দলের জার্সিতে অভিষেক হয় তার। তখনই বোঝা যাচ্ছিল, ব্রাজিল নতুন এক তারকার অপেক্ষায় আছে।

রিয়াল মাদ্রিদে সংগ্রাম থেকে সাফল্য

কৈশোরেই ইউরোপের সবচেয়ে সফল ক্লাবগুলোর একটি রিয়াল মাদ্রিদ তাকে দলে ভেড়ায়। কিন্তু নতুন দেশে মানিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। ভাষা, সংস্কৃতি, পরিবেশ-সবকিছুই ছিল ভিন্ন।

শুরুর দিনগুলোতে সমালোচনাও কম শুনতে হয়নি। তবে তিনি থেমে যাননি। নিজের দুর্বলতা নিয়ে কাজ করেছেন, উন্নতি করেছেন প্রতিদিন। সেই পরিশ্রমই একসময় তাকে রিয়াল মাদ্রিদের অন্যতম নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়ে পরিণত করে।

এ পর্যন্ত ক্লাবটির হয়ে তিনি একাধিক লিগ শিরোপা জিতেছেন। ইউরোপের সর্বোচ্চ ক্লাব প্রতিযোগিতার ট্রফিও উঠেছে তার হাতে দুইবার। শুধু তাই নয়, দুটি ইউরোপীয় ফাইনালেও গোল করে বড় মঞ্চে নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করেছেন।

তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৪ সালে তিনি জিতে নেন ফিফা বর্ষসেরা পুরুষ ফুটবলারের পুরস্কার।

‘মালভাদেজা’ থেকে জাতীয় নায়ক

ব্রাজিলে অনেক সমর্থক তাকে ডাকেন ‘মালভাদেজা’ নামে। শব্দটির অর্থ প্রায় ‘ভয়ংকর’ বা ‘আতঙ্কের কারণ’। নামটির যথার্থতাও প্রমাণ করেন তিনি মাঠে। বল পায়ে তার গতি ও দক্ষতা প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

গত বিশ্বকাপে তার যাত্রা থেমে গিয়েছিল কোয়ার্টার ফাইনালে। সেই ব্যর্থতা তাকে আরও পরিণত করে। নতুন লক্ষ্য নিয়ে আবারও জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামেন তিনি।

বর্তমান আসরে ব্রাজিলের আক্রমণের প্রধান ভরসা এখন ভিনিসিয়ুস। প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিপক্ষে ড্র করলেও পরের ম্যাচে হাইতির বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানে জয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

এরপর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষেও একই ব্যবধানে জয়ে দলের নায়ক হয়ে ওঠেন। ম্যাচের শুরুতেই গোল করে দলকে এগিয়ে দেন, বিরতির আগে করেন দ্বিতীয় গোল। এই দুই গোলের সুবাদে টুর্নামেন্টে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় চারটিতে, যা তাকে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে অন্যতম দাবিদার করে তুলেছে।

ইতিহাসের পাতায় নতুন নাম

গ্রুপপর্বে ধারাবাহিক গোল করে ভিনিসিয়ুস এমন এক কীর্তি গড়েছেন, যা ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে ২৪ বছর পর দেখা গেল। এর মাধ্যমে তিনি সেই বিশেষ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন, যেখানে একসময় ছিলেন কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও ও রিভালদোর মতো তারকারা।

স্বপ্নের দৌড় এখনও চলছে

একসময় ছোট্ট একটি ফুটসাল কোর্টে বল পায়ে ছুটে বেড়ানো সেই ছেলেটিই আজ ব্রাজিলের কোটি মানুষের আশা-ভরসার প্রতীক। তার প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি ড্রিবল আর প্রতিটি গোল এখন শুধু একটি ম্যাচের গল্প নয়-এটি সংগ্রাম, অধ্যবসায় এবং স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার গল্প।

ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের যাত্রা তাই কেবল একজন ফুটবলারের সাফল্যগাথা নয়; এটি প্রমাণ করে, সীমাবদ্ধতা যতই থাকুক, বিশ্বাস আর পরিশ্রম থাকলে বিশ্বমঞ্চও একদিন হাতের নাগালে চলে আসে।

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত