ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

কাগজে কোটি কোটি টাকা, ব্যাংকে হদিস নেই; বীমা খাতে বড় জালিয়াতির শঙ্কা

২০২৬ জুন ০৪ ১০:১৬:৪৩

কাগজে কোটি কোটি টাকা, ব্যাংকে হদিস নেই; বীমা খাতে বড় জালিয়াতির শঙ্কা

অর্থনীতি ডেস্ক: দেশের সাধারণ বীমা (জেনারেল ইন্স্যুরেন্স) খাতের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় বীমা কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখানো কোটি কোটি টাকার নগদ অর্থ ও ব্যাংকে রাখা স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) কোনো ডিরেক্ট ব্যাংক কনফার্মেশন পাননি নিরীক্ষকরা (অডিটর)।

তৃতীয় পক্ষের কোনো যাচাইকরণ না থাকায় এই বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রকৃত অস্তিত্ব নিয়েই তীব্র সংশয় দেখা দিয়েছে। এর ফলে অন্তত সাতটি বড় বীমা কোম্পানির ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে অডিটররা ‘কোয়ালিফাইড অপিনিয়ন’ (আপত্তিসূচক মতামত) এবং ‘অ্যাম্পাসিস অব ম্যাটার’ (বিশেষ পর্যবেক্ষণ) অনুচ্ছেদ যুক্ত করতে বাধ্য হয়েছেন।

বাজার সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এর পেছনে ভুয়া নথিপত্র তৈরি কিংবা কোম্পানির মোট সম্পদ বাড়িয়ে দেখানোর মতো বড় ধরনের আর্থিক কারচুপি লুকিয়ে থাকতে পারে।

অডিটরদের প্রতিবেদনে উঠে আসা এই গরমিলের পরিমাণ রীতিমতো আকাশছোঁয়া। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স পিএলসি। কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখানো ১২০ কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্সের কোনো সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেননি নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান ইসলাম জাহিদ অ্যান্ড কোং। এই অর্থ কোম্পানিটির মোট নগদ সম্পদের ৯৮ শতাংশ এবং সামগ্রিক সম্পদের প্রায় অর্ধেক।

অডিট রিপোর্টে জানা গেছে, এই টাকা ৪৬টি ব্যাংকের ৫৬৩টি অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এর মধ্যে ২৬.৩৯ কোটি টাকাই রাখা হয়েছে তীব্র তারল্য সংকটে থাকা পাঁচটি দুর্বল ব্যাংকে, যা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। অথচ কোম্পানি কর্তৃপক্ষ এই সম্ভাব্য লোকসান আর্থিক প্রতিবেদনে আড়াল করে মুনাফা বাড়িয়ে দেখিয়েছে।

অনুরূপভাবে নর্দার্ন ইসলামী ইন্স্যুরেন্স পিএলসি-র অডিটর কে এম আলম অ্যান্ড কোং জানিয়েছে, কোম্পানিটির ৮২.৫৫ কোটি টাকার ৭৪৭টি স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) বিপরীতে কোনো ব্যাংক কনফার্মেশন পাওয়া যায়নি। এছাড়া ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্সের ৪২ কোটি টাকা এবং সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্সের ৬৯.৭২ কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্সের একটি বড় অংশের কোনো সত্যতা মেলেনি। ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্সের ক্ষেত্রে ২০৭টি এফডিআর অ্যাকাউন্টসহ ২৪.৪২ কোটি টাকার কোনো জবাব দেয়নি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো।

দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি অডিট ফার্মের অংশীদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরাসরি ব্যাংক থেকে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করাই অডিটের মূল ভিত্তি। এটি না পাওয়ার অর্থ হলো, হয় সেই টাকা ব্যাংকে নেই অথবা অডিটরদের সামনে ভুয়া কাগজপত্র প্রদর্শন করা হয়েছে। এভাবে কাগজ-কলমে কোম্পানিকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী দেখিয়ে বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।

এই চরম অব্যবস্থাপনার বিষয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি গণমাধ্যমকে বলেন, অডিটরদের এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুতর একটি বিষয়। যদি প্রতিবেদনে দেখানো এই অর্থ বাস্তবে না থাকে, তবে তা একটি মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

তবে তিনি নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে বলেন, পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে আইডিআরএ অনেক সময় অডিটরদের এই ধরনের পর্যবেক্ষণগুলোর সঠিক তদন্ত বা তদারকি করতে পারে না।

অন্যদিকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, কমিশন এই নিরীক্ষা নোটগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে এবং এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে নিজস্ব স্বাধীন তদন্ত শুরু করবে। যদি কোনো কোম্পানি নগদ অর্থের তথ্য গোপন বা মিথ্যাচার করে থাকে, তবে বাজারের সততা রক্ষায় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই বিষয়ে ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের কোম্পানি সচিব কাজী ফারহানা বিস্তারিত মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, তারা আসন্ন বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) এর আনুষ্ঠানিক জবাব দেবেন। নর্দার্ন ইসলামী এবং ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্সসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোও এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

এমজে/

শেয়ারবাজারের বিশ্লেষণ ও ইনসাইড স্টোরি পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

দেশের বাজারে কমল সোনার দাম, ভরি কত?

দেশের বাজারে কমল সোনার দাম, ভরি কত?

নিজস্ব প্রতিবেদক: সোনাপ্রেমীদের জন্য স্বস্তির খবর। দেশের বাজারে আবারও কমানো হয়েছে সোনার দাম। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ... বিস্তারিত