ঢাকা, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩
বিয়ের সিদ্ধান্তে ইস্তেখারা কেন গুরুত্বপূর্ণ, জানুন বিস্তারিত
ডুয়া ডেস্ক: বিয়ে মানুষের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। একজন মানুষ কাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করবেন, কার সঙ্গে জীবনের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেবেন, সংসার গড়বেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত্তি নির্মাণ করবেন তা শুধু আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় নয়। এখানে পছন্দের পাশাপাশি বিচক্ষণতা, পরামর্শ এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরতা প্রয়োজন। আর এ জায়গাতেই ইস্তেখারার গুরুত্ব।
ইস্তেখারা শব্দের অর্থ কল্যাণ প্রার্থনা করা। কোনো বৈধ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বান্দা যখন নিজের সীমিত জ্ঞান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অজ্ঞতার কথা স্বীকার করে আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনা করেন, সেটিই ইস্তেখারার মূল উদ্দেশ্য। কারণ মানুষ বর্তমানকে দেখে সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু মহান আল্লাহ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবই জানেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা কোনো বিষয়কে অপছন্দ করো, অথচ তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে; আবার কোনো বিষয়কে পছন্দ করো, অথচ তাতে তোমাদের জন্য অকল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬)
বিবাহের ক্ষেত্রে এই আয়াতের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। অনেক সময় বাহ্যিক সৌন্দর্য, অর্থনৈতিক সামর্থ্য, সামাজিক মর্যাদা কিংবা আবেগের কারণে কাউকে পছন্দ হতে পারে। কিন্তু একজন মানুষ ভবিষ্যতে কেমন জীবনসঙ্গী হবেন, তাঁর চরিত্র কেমন হবে কিংবা সংসারে তাঁর আচরণ কেমন হবে—তা নিশ্চিতভাবে জানা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই নিজের পছন্দ ও বিচার-বিবেচনার পাশাপাশি আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়া একজন মুমিনের একান্ত কর্তব্য।
ইস্তেখারার গুরুত্ব বোঝাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)। তিনি বলেছেন,
كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يُعَلِّمُنَا الاِسْتِخَارَةَ فِي الأُمُورِ كُلِّهَا كَالسُّورَةِ مِنَ الْقُرْآنِ " إِذَا هَمَّ بِالأَمْرِ فَلْيَرْكَعْ رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ يَقُولُ
“রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের সকল কাজের জন্য ইস্তিখারা শিক্ষা দিতেন, যেমনভাবে তিনি কোরআনের সুরা শিক্ষা দিতেন। (আর বলতেন) যখন তোমাদের কারো কোনো বিশেষ কাজ করার ইচ্ছে হয়, তখন সে যেন দু’ রাকাত সালাত আদায় করে এরূপ দোয়া করে....” (বুখারি, হাদিস: ৬৩৮২)
খেয়াল করার বিষয় হলো, সাহাবি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের ‘সব বিষয়ে’ ইস্তেখারা শিক্ষা দিতেন। অর্থাৎ এটি কেবল বড় কোনো সংকটের আমল নয়; বরং বৈধ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়ার একটি সুন্নাহ। আর বিবাহ যেহেতু মানুষের জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত, তাই এ ক্ষেত্রে ইস্তেখারার তাৎপর্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
বিবাহের জন্য ইস্তেখারার দোয়া
জাবির (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসেই রাসুলুল্লাহ (সা.) ইস্তেখারার দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। দোয়াটি হলো:
اَللّٰهُمّ إِنِّيْ أَسْتَخِيْرُكَ بِعِلْمِكَ وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ، وَأَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيْمِ، فَإِنَّكَ تَقْدِرُ وَلاَ أَقْدِرُ، وَتَعْلَمُ وَلاَ أَعْلَمُ، وَأَنْتَ عَلَّامُ الغُيُوْبِ، اَللّٰهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الأَمْرَ خَيْرٌ لِيْ فِيْ دِيْنِيْ وَمَعَاشِيْ وَعَاقِبَةِ أَمْرِيْ فَاقْدُرْهُ لِيْ وَيَسِّرْهُ لِيْ، ثُمَّ بَارِكْ لِيْ فِيْهِ. وَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الأَمْرَ شَرٌّ لِيْ فِيْ دِيْنِيْ وَمَعَاشِيْ وَعَاقِبَةِ أَمْرِيْ فَاصْرِفْهُ عَنِّيْ وَاصْرِفْنِيْ عَنْهُ، وَاقْدُرْ لِيَ الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ، ثُمَّ أَرْضِنِيْ بِه.
বাংলা উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মা ইন্নী আসতাখীরুকা বি‘ইলমিকা, ওয়া আসতাকদিরুকা বিকুদরাতিক, ওয়া আসআলুকা মিন ফাদলিকাল ‘আযীম, ফাইন্নাকা তাকদিরু ওয়ালা আকদিরু, ওয়া তা‘লামু ওয়ালা আ‘লামু, ওয়া আনতা ‘আল্লামুল গুয়ূব। আল্লাহুম্মা ইন কুনতা তা‘লামু আন্না হাযাল আমরা খাইরুল লী ফী দ্বীনী, ওয়া মা‘আশী, ওয়া ‘আকিবাতি আমরী, ফাকদুরহু লী ওয়া ইয়াসসিরহু লী, সুম্মা বারিক লী ফীহি। ওয়া ইন কুনতা তা‘লামু আন্না হাযাল আমরা শাররুল লী ফী দ্বীনী, ওয়া মা‘আশী, ওয়া ‘আকিবাতি আমরী, ফাসরিফহু ‘আন্নী ওয়াসরিফনী ‘আনহু, ওয়াকদুর লিয়াল খাইরা হাইসু কানা, সুম্মা আরদিনী বিহি।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার ইলমের ওসিলায় আপনার কাছে (আমার উদ্দিষ্ট বিষয়ের) কল্যাণ চাই এবং আপনার কুদরতের ওসিলায় আপনার কাছে (কল্যাণ অর্জনের) শক্তি চাই, আর আপনার কাছে চাই আপনার মহা অনুগ্রহের কিছু। কেননা, (সকল বিষয়ে) আপনার ক্ষমতা রয়েছে, আমার কোনো ক্ষমতা নেই। আপনি (সবকিছু) জানেন, আমি কিছুই জানি না। আপনি তো আল্লামুল গুয়ূব—গায়েবের সকল বিষয়ে সম্যক অবগত। (অর্থাৎ আমার কাঙ্ক্ষিত বিষয়টি আমার জন্য কল্যাণকর কি না—তা আপনিই জানেন, আমি জানি না।) হে আল্লাহ! আমার দ্বীন, আমার জীবন-জীবিকা ও কাজের পরিণামের বিচারে যদি এ বিষয়টি আমার জন্য কল্যাণকর বলে জানেন, তাহলে আমার ভাগ্যে তা নির্ধারণ করে দিন এবং বিষয়টিকে আমার জন্য সহজ করে দিন। এরপর তাতে আমার জন্য বরকত দান করুন।
আর যদি বিষয়টি আমার দ্বীন, আমার জীবন-জীবিকা ও কাজের পরিণাম বিচারে আমার জন্য ক্ষতিকর বলে জানেন, তাহলে আপনি তা আমার থেকে সরিয়ে দিন এবং আমাকে তা থেকে ফিরিয়ে রাখুন। আর আমার জন্য কল্যাণের ফায়সালা করুন; তা যেখানেই হোক। অতঃপর তাতেই যেন আমি সন্তুষ্ট হয়ে যাই, সেই তাওফিক দান করুন। (বুখারি, হাদিস: ৬৩৮২)
দোয়ায় “هَذَا الْأَمْرَ” (এই কাজটি)-এর স্থানে নিজের নির্দিষ্ট বিষয়টি মনে কল্পনা করা বা উল্লেখ করা যায়। বিবাহের ক্ষেত্রে যেমন কোনো নির্দিষ্ট পাত্র বা পাত্রীকে বিবাহ করার বিষয়টি উদ্দেশ্য হতে পারে।
ইস্তেখারা সম্পর্কে সমাজে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা হলো, ইস্তেখারা করার পর স্বপ্নে সাদা বা সবুজ রং দেখা গেলে ভালো এবং কালো বা লাল কিছু দেখলে খারাপ। কিন্তু সহিহ হাদিসে ইস্তেখারার ফল নির্ধারণের জন্য এমন কোনো স্বপ্ন বা রঙের কথা বলা হয়নি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) যে দোয়া শিখিয়েছেন, সেখানে বান্দা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছে—‘যদি বিষয়টি কল্যাণকর হয় তাহলে তা আমার জন্য নির্ধারণ করুন এবং সহজ করে দিন’; আর যদি অকল্যাণকর হয়, তাহলে তা আমার কাছ থেকে সরিয়ে দিন এবং আমাকে তা থেকে সরিয়ে দিন।
সুতরাং ইস্তেখারার পর স্বপ্ন দেখা আবশ্যক নয়। বরং কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শরিয়তসম্মত যাচাই, পরামর্শ ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনার পর আল্লাহর ওপর ভরসা করে এগিয়ে যাওয়া এবং বিষয়টি সহজ হওয়া বা বাধা সৃষ্টি হওয়ার বিষয়গুলোকে স্বাভাবিকভাবে বিবেচনা করা ইস্তেখারার চেতনার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মনে রাখতে হবে, ইস্তেখারা কখনোই পাত্র-পাত্রীর খোঁজখবর নেওয়ার বিকল্প নয়। ইস্তেখারা করার অর্থ নিজের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়া নয়। বরং ইসলাম একই সঙ্গে তথ্য যাচাই, পরামর্শ এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতে শিক্ষা দেয়।
বিবাহের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ
‘তোমরা যে ব্যক্তির দীনদারী ও নৈতিক চরিত্রে সন্তুষ্ট আছ, তোমাদের নিকট সে ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব করলে তবে তার সঙ্গে বিয়ে দাও।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১০৮৪)
ইস্তেখারার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, মানুষ নিজের পছন্দকে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর অগ্রাধিকার দেবে না। আমরা অনেক সময় কোনো একজন মানুষকে নিয়ে এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি যে, সম্পর্কটি আমাদের জন্য ভালো হবে কি না, তা ভাবার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলি। ইস্তেখারা সেই আবেগের ভেতর আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের একটি দরজা খুলে দেয়।
ইস্তেখারার দোয়ায় একজন মানুষ মূলত স্বীকার করে নেয়: ‘আপনি জানেন, আমি জানি না।’ এই স্বীকারোক্তিই একজন মুমিনের শক্তি। কারণ সে জানে, নিজের পছন্দের মানুষটি হয়তো তার জন্য কল্যাণকর নাও হতে পারেন; আবার যে সম্পর্কটি কোনো কারণে ভেঙে গেল, সেটিই হয়তো ভবিষ্যতের বড় অকল্যাণ থেকে তাকে রক্ষা করেছে।
তাই ইস্তেখারা কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়, স্বপ্ন দেখার অপেক্ষাও নয়। এটি হলো নিজের সীমাবদ্ধ জ্ঞানকে আল্লাহর অসীম জ্ঞানের কাছে সমর্পণ করা। বিবাহের মতো আজীবন প্রভাব বিস্তারকারী সিদ্ধান্তে এই আত্মসমর্পণের মূল্য আরও বেশি।
এই আত্মসমর্পণের কারণে সেই কাজে কোনো অপ্রত্যাশিত বিষয় থাকলেও মহান আল্লাহ নিজ রহমতে সেসব বিদূরিত করে দিতে পারেন। এটাই ইস্তেখারার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
মহান আল্লাহ আমাদের সকল বিবাহসহ সকল বৈধ কাজে ইস্তেখারা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (৩ সেপ্টেম্বর)
- জেনে নিন একাদশ-আলিমে ভর্তির আবেদন পদ্ধতি
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (৪ সেপ্টেম্বর)
- পে স্কেল নিয়ে নতুন বিজ্ঞপ্তি দিল অর্থ মন্ত্রণালয়
- জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ রিলিজ স্লিপের ফল প্রকাশ
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (৬ সেপ্টেম্বর)
- নবম পে-স্কেল অনুমোদন, বেতন বাড়ল কত
- শিক্ষক নিয়োগ দেবে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
- কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
- মেসির দুই সহায়তাতেও আটলান্টার সঙ্গে ড্র ইন্টার মিয়ামির
- জিয়া উদ্যানের লেকে মাছের পোনা অবমুক্ত করলেন প্রধানমন্ত্রী
- নতুন পে-স্কেলে কত বাড়ছে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন-ভাতা?
- মাসে ২৫০০ টাকা বৃত্তি দেবে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, জানুন আবেদন পদ্ধতি
- তারেক রহমানের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাত করতে চান ট্রাম্প
- নতুন পে স্কেলের প্রজ্ঞাপনের তারিখ চূড়ান্ত, জানালেন অর্থসচিব