×

ঢাকা, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩

পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারে দরবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছে সিএএল বাংলাদেশ

২০২৬ অক্টোবর ১৯ ০৮:১৭:০৬

পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারে দরবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছে সিএএল বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারের দর ৪৪ থেকে ৮১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিনিয়োগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএএল বাংলাদেশ। ব্যাংক খাতে সংস্কার ও আর্থিক পুনর্বিন্যাসের ফলে তুলনামূলক শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ এবং বাজার হিস্যা বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি। সম্ভাবনাময় ব্যাংকের তালিকায় রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংক।

‘ব্যাংকিং অন দ্য নেক্সট সাইকেল’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে সম্পদের গুণগত মান, মূলধন পর্যাপ্ততা, তহবিলের সক্ষমতা এবং ঋণ বিতরণের সামর্থ্য বিবেচনায় ১৪টি ব্যাংককে ‘সাইকেল-রেডি’ বা ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিএএল বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটির মতে, চলমান আর্থিক পুনর্বিন্যাসের চাপ সামাল দেওয়ার পাশাপাশি ঋণের চাহিদা পুনরুদ্ধারের সুফল নিতে এসব ব্যাংক তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে।

প্রতিবেদনে পাঁচটি ব্যাংকের সম্ভাব্য লক্ষ্যদরও তুলে ধরা হয়েছে। গত ৫ অক্টোবরের সমাপনী দরকে ভিত্তি ধরে ব্র্যাক ব্যাংকের শেয়ারের লক্ষ্যদর নির্ধারণ করা হয়েছে ১১৭ টাকা ৪৫ পয়সা। ওই দিন শেয়ারটির সমাপনী দর ছিল ৬৫ টাকা। সে হিসাবে সম্ভাব্য দরবৃদ্ধির হার ৮০ দশমিক ৭ শতাংশ। সিটি ব্যাংকের লক্ষ্যদর ৪৮ টাকা ৩৬ পয়সা, যেখানে ভিত্তিমূল্য ছিল ২৯ টাকা ৭০ পয়সা। এতে সম্ভাব্য দরবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ৬২ দশমিক ৮ শতাংশ।

ইস্টার্ন ব্যাংকের শেয়ারের লক্ষ্যদর নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৪ টাকা ৩৮ পয়সা। ২২ টাকা ৮০ পয়সার সমাপনী দরের তুলনায় এটি ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের শেয়ারের সমাপনী দর ৪৫ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে লক্ষ্যদর ৬৭ টাকা ২৫ পয়সা হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে সম্ভাব্য দরবৃদ্ধি ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে, ৩৮ টাকা ৮০ পয়সা সমাপনী দরের বিপরীতে পূবালী ব্যাংকের লক্ষ্যদর ৫৫ টাকা ৮৮ পয়সা। সে হিসাবে শেয়ারটির সম্ভাব্য দরবৃদ্ধি ৪৪ শতাংশ। এসব হিসাবের মধ্যে নগদ লভ্যাংশ থেকে সম্ভাব্য আয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

শক্তিশালী ব্যাংকের ঋণ সম্প্রসারণের সুযোগ

সিএএল বাংলাদেশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশন সংরক্ষণের কঠোর শর্ত ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতাগুলো প্রকাশ করেছে। এ পরিস্থিতিতে আমানত সংগ্রহ এবং ভবিষ্যতে ঋণ সম্প্রসারণের সুযোগ তুলনামূলক ভালো মূলধনসম্পন্ন ব্যাংকগুলোর দিকে সরে যেতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রভিশন ঘাটতি ছিল ২ দশমিক ২ লাখ কোটি টাকা। এ ছাড়া সংকটে থাকা ১০টি ব্যাংকের হাতে ছিল মোট খেলাপি ঋণের ৭৪ শতাংশ। এসব তথ্য ব্যাংক খাতে সম্পদের গুণগত সমস্যার কেন্দ্রীভবন তুলে ধরে।

এর বিপরীতে, ‘সাইকেল-রেডি’ হিসেবে চিহ্নিত ১৪টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের মধ্যম অনুপাত ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এসব ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ছিল ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ, যা গবেষণায় ব্যবহৃত ১২ দশমিক ৫ শতাংশের মানদণ্ডের চেয়ে বেশি। নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত এসব ব্যাংকের মূলধনের পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। ঋণের চাহিদা বাড়লে এই বাড়তি মূলধন ঋণ বিতরণ সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।

সিএএল বাংলাদেশের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ১২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে ২০২৬ সালের জুনের তুলনায় দেশের বেসরকারি খাতের ঋণের পরিমাণ ৬ দশমিক ২৩ লাখ কোটি টাকা বাড়তে পারে। প্রত্যাশিত এই ঋণ সম্প্রসারণের ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ আসতে পারে চিহ্নিত ১৪টি ব্যাংক থেকে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ঋণ পুনরুদ্ধারের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যক্তি পর্যায়ের ঋণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (এসএমই) অর্থায়ন, ভোক্তা ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়তে পারে। পরবর্তী সময়ে করপোরেট ঋণ, আমদানি অর্থায়ন ও বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট সেবায় গতি আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

ব্যাংকভিত্তিক বিশ্লেষণে সিএএল বাংলাদেশ জানিয়েছে, ব্র্যাক ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধি, এসএমই খাতে শক্তিশালী অবস্থান এবং মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশে অংশীদারত্ব ব্যাংকটির প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে। সিটি ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড, পেমেন্ট এবং খুচরা ব্যাংকিং ব্যবসার মাধ্যমে ভোক্তা ব্যয় পুনরুদ্ধারের সুফল পেতে পারে।

ইস্টার্ন ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওতে পর্যাপ্ত প্রভিশন এবং লেনদেনভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রমকে প্রবৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। পূবালী ব্যাংকের দেশজুড়ে বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঋণ সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের কম খরচের আমানত এবং বিস্তৃত বিতরণ নেটওয়ার্ক অতিরিক্ত তারল্যকে ঋণে রূপান্তরে সহায়তা করতে পারে।

সংকট ও সুদহারের সীমায় ঝুঁকিও রয়েছে

শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর জন্য সম্ভাবনা তৈরি হলেও কয়েকটি ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছে সিএএল বাংলাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক সংকট অন্য প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়া, ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধানের ওপর নিয়ন্ত্রক সীমা এবং বড় করপোরেট গ্রাহকদের কাছে ঋণ অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত থাকা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ২২টি লোকসান করেছে। এ ছাড়া ১৯টি ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত আইনগত ন্যূনতম সীমার নিচে ছিল। সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুরবস্থা পুরো ব্যাংক খাতে তারল্যচাপ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

ঋণ ও আমানতের ভারিত গড় সুদহারের ব্যবধান ৪ শতাংশে সীমিত রাখার বিধান কার্যকর হলে ব্যাংকগুলোর নিট সুদ আয় বা নেট ইন্টারেস্ট মার্জিনে চাপ তৈরি হতে পারে। সিএএল বাংলাদেশের হিসাবে, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৫৫টি ব্যাংক নির্ধারিত সীমার ওপরে ছিল। এ তালিকায় ‘সাইকেল-রেডি’ হিসেবে চিহ্নিত ১৪টি ব্যাংকের মধ্যে ১৩টিও রয়েছে।

বড় করপোরেট ঋণগ্রহীতাদের কাছে ঋণ কেন্দ্রীভূত থাকাও ব্যাংক খাতের অন্যতম ঝুঁকি। কোনো বড় ঋণ পুনর্গঠন করতে হলে কিংবা ঋণ নতুন করে শ্রেণীকরণ করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হতে পারে। এতে কোনো কোনো ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সামগ্রিক ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েও সিএএল বাংলাদেশ মনে করছে, নিজস্ব মূলধনের বিপরীতে আয় বা রিটার্ন অন ইকুইটির তুলনায় সুপারিশ করা পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারের মূল্যায়ন আকর্ষণীয়। তবে লক্ষ্যদর অনুযায়ী সম্ভাব্য মুনাফা অর্জন নির্ভর করবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি, ঋণের চাহিদা এবং ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান ও নিয়ন্ত্রক ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর।

ইএইচপি

শেয়ারবাজারের বিশ্লেষণ ও ইনসাইড স্টোরি পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

শেয়ারবাজার এর অন্যান্য সংবাদ

আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (১৮ অক্টোবর)

আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (১৮ অক্টোবর)

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বাজারে স্বর্ণ ও রুপার দাম কমানোর পর বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) নির্ধারিত মূল্যেই বিক্রি হচ্ছে এসব মূল্যবান... বিস্তারিত