×

ঢাকা, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩

প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে চট্টগ্রামে প্রস্তুতি, নিরাপত্তায় ২০ হাজার সদস্য

২০২৬ অক্টোবর ১৯ ১১:০০:০৩

প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে চট্টগ্রামে প্রস্তুতি, নিরাপত্তায় ২০ হাজার সদস্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চট্টগ্রাম সফর সামনে রেখে নগরজুড়ে চলছে নানা প্রস্তুতি। রহমতগঞ্জের জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপে সাজসজ্জা, প্যান্ডেল নির্মাণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও আলোকসজ্জার কাজ চলছে। পাশাপাশি নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে সংস্কার ও কার্পেটিং, সড়ক বিভাজকে নতুন করে রং করা, পোস্টার অপসারণ এবং ফুটপাতের অবৈধ দোকান উচ্ছেদের কাজও চলছে।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধানের চট্টগ্রামে এসে দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনের ঘটনা এবারই প্রথম।

তারেক রহমানের আগমনকে ঘিরে নগরে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পূজার আয়োজনে যোগ হয়েছে বাড়তি উৎসাহ। একই সঙ্গে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের তৎপরতা বেড়েছে। সফর নির্বিঘ্ন করতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয় ও প্রস্তুতিমূলক বৈঠক চলছে।

সোমবার নগরের কাজীর দেউড়ি, জামালখান ও আন্দরকিল্লা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন সড়কে কার্পেটিং করা হয়েছে এবং সড়ক বিভাজকে নতুন রং লাগানো হয়েছে। সরানো হচ্ছে পোস্টার ও ব্যানার, উচ্ছেদ করা হয়েছে ফুটপাতের অবৈধ দোকানপাট। জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপেও চলছে সাজসজ্জা ও অতিথিদের অভ্যর্থনা জানানোর প্রস্তুতি।

প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে নগরের সড়ক ও স্থাপনার সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি দুর্গোৎসবের আয়োজনেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাড়তি গুরুত্ব যুক্ত হয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর বিএনপির স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক বৈঠকেও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।

পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের পর সাংগঠনিক সভা

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, মহানগর বিএনপি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি আর্থিক অনুদান দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। প্রায় ৪০ মিনিট সেখানে অবস্থানের পর নগরের হোটেল র‍্যাডিসন ব্লুতে বিএনপির নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সভায় যোগ দেবেন তিনি। এরপর রাতে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।

সাংগঠনিক সভায় বিএনপির চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা ইউনিটের নেতারা অংশ নেবেন। মহানগর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটির সদস্যদের পাশাপাশি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ পাঁচ নেতা, সংসদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কমিটি না থাকায় ওই জেলার জ্যেষ্ঠ নেতারা সভায় অংশ নেবেন।

বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সভা করবেন। এতে সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতারাও থাকবেন।

দলের স্থানীয় জ্যেষ্ঠ নেতাদের ধারণা, পূর্ণাঙ্গ কমিটির সদস্যদের নিয়ে এ ধরনের সভা তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠকদের মূল্যায়নের সুযোগ করে দেবে। পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমেও নতুন গতি আসতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর সফর নির্বিঘ্ন করতে কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রস্তুতি চলছে। গত শনিবার সকালে জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ এবং সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান।

একই দিন মণ্ডপটি পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী ও এসআরবি-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান। দুপুরে সেখানে যান চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ও সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান।

এর আগে ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রাম জেলা পরিষদে বিএনপি, মহানগর পূজা উদ্‌যাপন পরিষদ, বাংলাদেশ জন্মাষ্টমী উদ্‌যাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের নেতাদের নিয়ে মতবিনিময় সভা হয়। ১৬ অক্টোবর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের রেস্ট হাউসেও বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন রাতে পানি সম্পদমন্ত্রী ও চট্টগ্রাম জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানির নেতৃত্বে প্রশাসন ও বিএনপির নেতাদের সঙ্গে অনলাইনে সভা হয়। একই রাতে চট্টগ্রাম মহানগর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতারাও বৈঠক করেন।

চট্টগ্রাম নগরের রহমতগঞ্জে অবস্থিত জে এম সেন হল প্রাঙ্গণ দুর্গাপূজা উদ্‌যাপনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রতিবছর সেখানে কেন্দ্রীয়ভাবে পূজার আয়োজন করা হয়। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসবের সময় প্রাঙ্গণটি সর্বজনীন মিলনমেলায় রূপ নেয়।

চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক অর্পণ কান্তি ব্যানার্জি বলেন, বন্দরনগরীর পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রী আসছেন—এ খবরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে সার্বিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান বলেন, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশ গড়ার যে লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী নির্ধারণ করেছেন, তা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তাঁর চট্টগ্রাম আগমন আনন্দের বিষয়। সফর সফল ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন।

চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান বলেন, চট্টগ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। তাঁর আগমনকে কেন্দ্র করে নগরে উৎসাহ ও আন্তরিকতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার সমান অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।নিরাপত্তায় চার স্তরের ব্যবস্থা

প্রধানমন্ত্রীর সফর ও দুর্গাপূজা উপলক্ষে চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় চার স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ, এসআরবি, আনসার ও বিজিবির ২০ হাজারের বেশি সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন।

এসআরবি-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখে এসএসএফের নির্দেশনা ও সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। র‍্যাব, পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও বিভাগীয় প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পূজামণ্ডপগুলো নিয়মিত পরিদর্শন, মোবাইল টহল এবং সাদাপোশাকে গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় থাকবে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ স্ট্রাইকিং ফোর্সও প্রস্তুত রাখা হবে।

তিনি জানান, চট্টগ্রাম মহানগরে প্রায় ২ হাজার ৬০০টি পূজামণ্ডপ রয়েছে। মণ্ডপের সংখ্যা বিবেচনায় রেখে আগেই নিরাপত্তার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মণ্ডপগুলোতে এসআরবির যোগাযোগ নম্বরও দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে প্রটোকল অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পূজামণ্ডপগুলোতে সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি সাদাপোশাকেও পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সভাপতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে পুলিশের সমন্বয় রয়েছে।

এদিকে, দুর্গাপূজা উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উপহার ও আর্থিক সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির নেতারা। বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম জানান, জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার শাড়ি ও লুঙ্গি বিতরণ করা হয়েছে। চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে বিভিন্ন মন্দির, সংগঠন ও পূজা উদ্‌যাপন কমিটির মাধ্যমে এসব উপহার দেওয়া হয়।

তিনি আরও জানান, গত ৯ অক্টোবর জে এম সেন হলের মাঠে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে পূজার উপহার বিতরণ করেন। এ ছাড়া নগর ও জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে চট্টগ্রামে প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা তৎপরতার পাশাপাশি চলছে দুর্গোৎসবের আয়োজন। পূজামণ্ডপে তাঁর উপস্থিতি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসবের আনন্দ আরও বাড়াবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের প্রত্যাশা, এই সফরের মাধ্যমে ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক সহাবস্থান ও সৌহার্দ্যের বার্তা আরও জোরালো হবে।

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত