×

ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ৭০ শতাংশের ভিসা প্রত্যাখ্যান, বাড়ছে উদ্বেগ

২০২৬ অক্টোবর ১৬ ১৬:৪৬:৪৯

নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ৭০ শতাংশের ভিসা প্রত্যাখ্যান, বাড়ছে উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: নিউজিল্যান্ডে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদনকারী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশটির সংবাদমাধ্যম রেডিও নিউজিল্যান্ড (RNZ)-এর ১৫ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের প্রায় ৭০ শতাংশের স্টুডেন্ট ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। একই সময়ে ভারতীয় আবেদনকারীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ছিল ৩৯ শতাংশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হার আগের স্বাভাবিক প্রবণতার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষা পরামর্শক এবং নিউজিল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে যারা উচ্চশিক্ষার জন্য নিউজিল্যান্ডকে নিজেদের গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন, তাদের অনেকেই এখন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়তে পারেন।

প্রশ্ন উঠেছে, কয়েকটি আবেদন ও এজেন্টের অনিয়মের কারণে কি প্রকৃত ও যোগ্য শিক্ষার্থীদের জন্যও বিদেশে উচ্চশিক্ষার পথ কঠিন হয়ে উঠছে? এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের করণীয় কী?

কেন বাড়ছে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার?

RNZ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিসা আবেদনে জালিয়াতি, আর্থিক নথিপত্রে অসংগতি এবং কিছু শিক্ষা এজেন্টের অধীনে কাজ করা সাব-এজেন্টদের মাধ্যমে ভুল বা ভুয়া তথ্য জমা দেওয়ার অভিযোগ পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।

নিউজিল্যান্ডের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ, Immigration New Zealand (INZ), জানিয়েছে, কিছু স্টুডেন্ট ভিসা আবেদনে ক্রমবর্ধমান জটিল জালিয়াতির ঘটনা শনাক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে প্রকৃত আর্থিক নথি পরিবর্তন করা, একই নথি একাধিক আবেদনকারীর ক্ষেত্রে পুনরায় ব্যবহার করা এবং অর্থের সক্ষমতা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপনের মতো বিষয় রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মাস্টার্স পর্যায়ের কিছু শিক্ষার্থী ভিসা আবেদনকে কেন্দ্র করে বিশেষ যাচাই-বাছাইয়ের কারণে প্রত্যাখ্যানের সংখ্যা বেড়েছে।

এ ধরনের অনিয়ম শুধু অভিবাসন ব্যবস্থার প্রতি আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং প্রকৃত শিক্ষার্থীদের আবেদনও কঠোর যাচাইয়ের মুখে ফেলতে পারে। তবে সব বাংলাদেশি আবেদনকারী অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, এমন ধারণা করা সম্পূর্ণ অনুচিত। প্রত্যেক আবেদনকারীর পরিস্থিতি, যোগ্যতা এবং নথিপত্র আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।

প্রকৃত শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কী?

বাংলাদেশের অনেক তরুণ উন্নত শিক্ষা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং পেশাগত দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে নিউজিল্যান্ডে পড়াশোনা করতে চান। অনেক পরিবার সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ব্যয় করে থাকে। কেউ কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফি, আবেদনসংক্রান্ত খরচ, ইংরেজি পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং অন্যান্য ব্যয় বহন করেন।

এ অবস্থায় ভিসা প্রত্যাখ্যাত হলে একজন শিক্ষার্থী শুধু বিদেশে পড়ার সুযোগই হারান না, আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক চাপেরও মুখোমুখি হতে পারেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভর্তি, আবাসন ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের পরিকল্পনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

তবে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৭০ শতাংশ হওয়ার অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর ভিসা প্রত্যাখ্যাত হবে। এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ে আবেদনকারীদের সিদ্ধান্তসংক্রান্ত পরিসংখ্যান। ব্যক্তিগত আবেদনের ফল নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট যোগ্যতা, নথিপত্র এবং অভিবাসননীতির শর্ত পূরণের ওপর।

শিক্ষার্থীদের করণীয় কী?

বর্তমান পরিস্থিতিতে নিউজিল্যান্ডে পড়তে আগ্রহী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আরও সতর্ক ও পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

১. আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ নিশ্চিত করা

শিক্ষার্থীদের ব্যাংক স্টেটমেন্ট, অর্থের উৎস, স্পনসরের আয় এবং অন্যান্য আর্থিক নথিপত্র সঠিক ও যাচাইযোগ্য হতে হবে। শুধু ব্যাংকে অর্থের পরিমাণ দেখানোই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী সেই অর্থ কোথা থেকে এসেছে তার গ্রহণযোগ্য প্রমাণও প্রস্তুত রাখতে হবে।

২. শিক্ষা এজেন্ট নির্বাচনে সতর্কতা

শুধু দ্রুত ভিসা পাওয়ার প্রতিশ্রুতি বা আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের ভিত্তিতে কোনো এজেন্ট নির্বাচন করা উচিত নয়। এজেন্টের পরিচয়, অভিজ্ঞতা, সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আবেদন প্রস্তুত করার পদ্ধতি যাচাই করতে হবে। নিউজিল্যান্ডের অভিবাসনবিষয়ক পরামর্শের জন্য প্রযোজ্য লাইসেন্স ও অনুমোদনের নিয়মও অনুসরণ করা জরুরি।

৩. নিজের আবেদন নিজে বুঝে নেওয়া

কোনো এজেন্ট আবেদন প্রস্তুত করলেও শিক্ষার্থীর নিজের জমা দেওয়া তথ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা উচিত। আবেদনে ভুল তথ্য, অসংগত বক্তব্য কিংবা অজানা কোনো নথি থাকলে তা শনাক্ত করার চেষ্টা করতে হবে। আবেদনপত্রের প্রতিটি তথ্য সত্য ও সঠিক হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৪. কোর্স নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা স্পষ্ট করা

কেন নির্দিষ্ট কোর্সে পড়তে চান, আগের শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী এবং এই শিক্ষা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় কীভাবে কাজে লাগবে, তা পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। শিক্ষার্থীর প্রকৃত উদ্দেশ্য ও শিক্ষাগত পরিকল্পনা যেন আবেদনপত্রে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

৫. ভিসা প্রত্যাখ্যাত হলে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া

ভিসা প্রত্যাখ্যাত হলে সিদ্ধান্তপত্রে উল্লেখ করা কারণগুলো মনোযোগ দিয়ে বুঝতে হবে। প্রয়োজন হলে যোগ্য অভিবাসন পরামর্শক বা আইনজীবীর সহায়তা নিতে হবে। সমস্যাগুলো সমাধান না করে একই ধরনের আবেদন পুনরায় জমা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। নতুন করে আবেদন করার আগে নিজের পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য বিকল্পগুলো যাচাই করা উচিত।

বাংলাদেশ সরকারের করণীয়

এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত শিক্ষার্থীদের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদনকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশে বাংলাদেশি মিশনের সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানোর নামে প্রতারণা, ভুয়া আর্থিক নথি তৈরি এবং মিথ্যা আশ্বাস দেওয়ার অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং আবেদনপূর্ব যাচাইয়ের ব্যবস্থা আরও সহজলভ্য করা দরকার।

এ ছাড়া নিউজিল্যান্ডের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রকৃত শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো তুলে ধরা যেতে পারে। আবেদন প্রত্যাখ্যানের প্রবণতা, নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এবং শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়ে তথ্যভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

নিউজিল্যান্ডের কর্তৃপক্ষের কাছে প্রত্যাশা

নিউজিল্যান্ডের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সব দেশের আবেদনকারীদের জন্য একই অভিবাসন শর্ত প্রযোজ্য এবং কোনো জাতীয়তার ভিত্তিতে পক্ষপাতমূলক মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। একই সঙ্গে কিছু মাস্টার্স পর্যায়ের আবেদনে বিশেষ যাচাই-বাছাইয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

জালিয়াতি প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া যেকোনো দেশের অভিবাসন ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই পদক্ষেপের পাশাপাশি প্রকৃত আবেদনকারীরা যেন নিজেদের যোগ্যতা ও আর্থিক সক্ষমতার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপনের ন্যায্য সুযোগ পান, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষার্থীদের আবেদন মূল্যায়নে স্বচ্ছতা, সিদ্ধান্তের স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ভুল বোঝাবুঝি সংশোধনের সুযোগ থাকলে প্রকৃত আবেদনকারীদের আস্থা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।বাংলাদেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ কি ঝুঁকিতে?

বিদেশে উচ্চশিক্ষা বাংলাদেশের তরুণদের জ্ঞান, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু বিদেশে পড়াশোনার ক্ষেত্রে অনিয়ম, ভুল তথ্য এবং অপরিকল্পিত আবেদন বাড়তে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের শিক্ষার্থীদের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এ কারণে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষা পরামর্শক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রত্যেকেরই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। একটি জাল আবেদন সাময়িকভাবে কোনো ব্যক্তির লাভের কারণ হলেও, এর নেতিবাচক প্রভাব অন্য অনেক প্রকৃত আবেদনকারীর ওপর পড়তে পারে।

একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, ভিসা প্রত্যাখ্যানের উচ্চ হার বাংলাদেশের সব শিক্ষার্থীর যোগ্যতার প্রতিফলন নয়। যারা প্রকৃত উদ্দেশ্যে পড়াশোনা করতে চান, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করেন এবং নির্ভরযোগ্য নথিপত্র জমা দেন, তাদের আবেদন ন্যায্যভাবে বিবেচিত হওয়া জরুরি।

শেষ কথা

নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের এই প্রবণতা সংশ্লিষ্ট সবার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এখনই প্রয়োজন প্রতারণা ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ, শিক্ষার্থীদের জন্য সঠিক তথ্য নিশ্চিত করা এবং আবেদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানো।

বাংলাদেশের মেধাবী তরুণদের আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন যেন অসাধু ব্যক্তিদের কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদেরও বুঝতে হবে, ভিসা পাওয়ার কোনো নিশ্চিত শর্টকাট নেই। সততা, সঠিক নথিপত্র, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং নিয়ম মেনে আবেদন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের প্রত্যাশা, অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ন্যায্য মূল্যায়ন ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর উদ্যোগ নেবে।

তথ্যসূত্র: Radio New Zealand (RNZ), ১৫ অক্টোবর ২০২৬; Immigration New Zealand-এর প্রকাশিত স্টুডেন্ট ভিসা-সংক্রান্ত তথ্য।

লেখক: জে পি তালাস, নিউজিল্যান্ড।

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (১৬ অক্টোবর)

আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (১৬ অক্টোবর)

ডুয়া ডেস্ক: বিশ্ববাজারের পরিস্থিতির প্রভাবে দেশের বাজারেও স্বর্ণের দামে পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) ভরিতে সর্বশেষ ৩ হাজার ২৬৬... বিস্তারিত